৪৮-৭২ ঘন্টায় ক্যাশ অন ডেলিভারি। ০১​৫​৮১১০০০০১​

মির্জা গালিব, মান্টো ও সমকালীনেরা
মির্জা গালিব, মান্টো ও সমকালীনেরা
337.50 ৳
450.00 ৳ (25% OFF)
PRE ORDER

ফ্রানৎসে ফানোঁ

পরাধীন মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের দিশারী

https://gronthik.com/web/image/product.template/2123/image_1920?unique=52c0084

477.75 ৳ 477.75 BDT 735.00 ৳

735.00 ৳

Not Available For Sale


This combination does not exist.

Out of Stock

ফ্রানৎস ফানোঁ: পরাধীন মানুষের মুক্তির দিশারী

ফ্রানৎস ফানোঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত ‘ফ্রানৎস ফানোঁ: পরাধীন মানুষের মুক্তির দিশারী’ একটি ব্যতিক্রমী সংকলন। ফানোঁকে কেবল একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ, দার্শনিক বা রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হিসেবে নয়, বরং পরাধীন মানুষের আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও মুক্তির প্রশ্নে এক অনন্য বিপ্লবী চিন্তক হিসেবে পাঠ করার একটি প্রয়াস এই বই। তাঁর মৃত্যুর বহু দশক পরও ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবাদ, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে ফানোঁর চিন্তা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। এই সংকলন সেই দীর্ঘ ও চলমান ফানোঁ-পাঠের বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

ফানোঁর চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—পরাধীন মানুষ কীভাবে সত্যিকার অর্থে মুক্ত মানুষ হয়ে উঠবে? তাঁর কাছে স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা, একটি রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তরের নাম নয়। ঔপনিবেশিক শাসন মানুষের ভূখণ্ড দখলের পাশাপাশি তার আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, মানসিকতা ও আত্মমর্যাদাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিনের আধিপত্য মানুষের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করে এবং তাকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেই অনিশ্চিত করে তোলে। তাই মুক্তি কেবল রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণ এবং নিজের অস্তিত্বের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

এই বইয়ের বিশেষত্ব হলো—এখানে ফানোঁকে একক কোনো তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়নি। বরং তাঁর জীবন, মনন, রাজনৈতিক দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, মার্ক্সবাদ, ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রাম, জাতীয় সংস্কৃতি, বর্ণবাদ ও বিপ্লবী রাজনীতির বিভিন্ন দিককে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংকলনের প্রথম অংশে ফানোঁকে নিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ। তাঁদের আলোচনায় যেমন ফানোঁর চিন্তার মূল সত্তা অনুসন্ধান করা হয়েছে, তেমনি তাঁর সঙ্গে আফ্রিকান ও ক্যারিবীয় চিন্তাধারার সম্পর্ক, তাঁর ওপর সার্ত্র, মার্ক্স, হেগেল ও মার্লো-পন্তির প্রভাব এবং চিন্তার ইতিহাসে তাঁর স্বাতন্ত্র্যও আলোচিত হয়েছে।

সংকলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ফানোঁর চিন্তার সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতার সম্পর্ক অনুসন্ধান করা হয়েছে। পূর্ববাংলার মুক্তির লড়াই, বাংলাদেশের ওপর ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতার প্রভাব এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে ফানোঁর তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বোঝার চেষ্টা রয়েছে। একইভাবে ‘জুলাই পেরিয়ে ফানোঁ’ প্রবন্ধে অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ফানোঁর চিন্তার আলোকে পাঠ করা হয়েছে। ফলে বইটি কেবল একজন বিদেশি চিন্তাবিদকে নিয়ে আলোচনা নয়; বরং নিজেদের ইতিহাস, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন চোখে দেখারও একটি সুযোগ তৈরি করে।

ফানোঁর চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্ণবাদ ও মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট। তিনি দেখিয়েছেন, বর্ণবাদ কেবল ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বিষয় নয়; এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত একটি কাঠামোগত বাস্তবতা, যা মানুষের আত্মপরিচয় ও সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক আধিপত্য কীভাবে মানুষের মনে হীনম্মন্যতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে, এই সংকলনের আলোচনায় তার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতি কীভাবে ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয় এবং মুক্তিসংগ্রাম কীভাবে নতুন জাতীয় চেতনা ও সংস্কৃতির নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, তাও আলোচিত হয়েছে।

বইটির দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ফানোঁর নিজের লেখা ও গুরুত্বপূর্ণ রচনার বাংলা অনুবাদ। ফলে পাঠক শুধু অন্যদের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ফানোঁকে জানবেন না; সরাসরি তাঁর চিন্তার জগতেও প্রবেশ করতে পারবেন। ‘নিগ্রো ও স্বীকৃতি’, ‘বর্ণবাদ ও সংস্কৃতি’, ‘জাতীয় সংস্কৃতির সহযোগী ক্ষেত্র এবং মুক্তিসংগ্রাম’, ‘উপনিবেশবাদের অবসান এবং স্বাধীনতা’, ‘কেন সশস্ত্র সংগ্রাম?’সহ বিভিন্ন রচনায় ফানোঁ মানুষের মুক্তি, বর্ণবাদ, সংস্কৃতি, সহিংসতা, জাতীয়তাবাদ ও ঔপনিবেশিকতার নানা প্রশ্ন নিয়ে তাঁর মৌলিক অবস্থান তুলে ধরেছেন।

এখানে ফানোঁর মনোবিশ্লেষণী চিন্তারও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। ব্যক্তির মানসিক সংকটকে তিনি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখেননি; বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে প্রচলিত মনোবিশ্লেষণের সীমা অতিক্রম করে উপনিবেশিত মানুষের মানসিক জগত ও সামাজিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিয়েছে। তাঁর এই চিন্তার আলোকে রাষ্ট্র, মানসিক অসুস্থতা, স্মৃতি, বাসনা ও সামাজিক কাঠামোর সম্পর্ক নিয়েও বইটিতে অনুবাদ ও আলোচনা রয়েছে।

ফানোঁর চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা আজ আলজেরিয়া বা আফ্রিকার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিলিস্তিনের চলমান সংগ্রাম, তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, বর্ণবাদ এবং ক্ষমতার অসম সম্পর্ক—সবকিছুর মধ্যেই তাঁর প্রশ্নগুলো নতুনভাবে ফিরে আসে। এই বইয়ে ফানোঁর তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করে ফিলিস্তিনের বাস্তবতাকেও পাঠের চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে পাঠকের সামনে ফানোঁ কেবল অতীতের একজন বিপ্লবী চিন্তাবিদ হিসেবে নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের সংকট বোঝার একটি কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবেও উপস্থিত হন।

এই সংকলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বৈচিত্র্য। এখানে গবেষণা, বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও অনুবাদ পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। ফানোঁর সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটাতে গিয়ে তাঁর সমসাময়িক ও উত্তরসূরি আফ্রিকান-ক্যারিবীয় চিন্তাবিদদের কথাও এসেছে। রডনি, সি. এল. আর. জেমস, জর্জ প্যাডমোরসহ বিভিন্ন চিন্তাবিদের প্রসঙ্গ ফানোঁর চিন্তার বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে বুঝতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে তাঁর জীবন, বিপ্লবী রাজনীতি ও চিন্তার বিভিন্ন বিতর্কিত দিকও আলোচনার বাইরে রাখা হয়নি।

বাংলা ভাষায় ফ্রানৎস ফানোঁকে পাঠের ক্ষেত্রে এই বই তাই একটি প্রবেশিকা ও সংকলন—দুই-ই। এটি ফানোঁর সম্পূর্ণ চিন্তার শেষ কথা নয়; বরং আরও বিস্তৃত ফানোঁ-পাঠের দরজা খুলে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। বইটির সম্পাদকীয় বক্তব্যেও সেই সীমাবোধ স্পষ্ট—একটি মাত্র বই দিয়ে ফানোঁকে সম্পূর্ণ বোঝা সম্ভব নয়। বরং এই বই নতুন পাঠক ও তরুণ গবেষকদের আরও গভীরভাবে ফানোঁ পড়তে এবং তাঁর চিন্তাকে নিজেদের সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে উৎসাহিত করতে চায়।

ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিশ্লেষণ, ঔপনিবেশিকতা ও মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে আগ্রহী পাঠকের জন্য ‘ফ্রানৎস ফানোঁ: পরাধীন মানুষের মুক্তির দিশারী’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। যারা জানতে চান—পরাধীনতা কীভাবে মানুষের মন ও সমাজকে নির্মাণ করে, মুক্তি কেন শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, এবং একটি জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদা পুনর্নির্মাণের পথে এগিয়ে যায়—তাদের জন্য এই বই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

ফানোঁ বলেছিলেন, প্রতিটি প্রজন্মের সামনে একটি দায়িত্ব থাকে—সে দায়িত্ব পালন করা, অথবা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এই বই সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়: মুক্ত মানুষ হওয়ার সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না।


মাহফুজুর রহমান শামীম

রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে জনযোগ পত্রিকার সম্পাদনা করছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ফ্রানৎস ফানোঁর জীবন ও চিন্তাকে পাঠক সমাজের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন। গণমুখী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একজন সংগঠক। বাংলাদেশ জনতার সংসদ (বাজস)-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

আজিজুল রাসেল

একজন গবেষক, প্রাবন্ধিক ও ইতিহাসের শিক্ষার্থী। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও ঔপনিবেশিকতা বিষয়ে তাঁর প্রবন্ধ ও অনুবাদ জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় যুক্ত, তিনি বর্তমানে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ধ্রুপদী স্টাডিজ বিভাগে পিএইচডি করছেন।

Publisher

গ্রন্থিক প্রকাশন

Language

বাংলা

Country

Bangladesh

Format

হার্ডব্যাক

Edition

1st

First Published

2026

Pages

344

ফ্রানৎস ফানোঁ: পরাধীন মানুষের মুক্তির দিশারী

ফ্রানৎস ফানোঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত ‘ফ্রানৎস ফানোঁ: পরাধীন মানুষের মুক্তির দিশারী’ একটি ব্যতিক্রমী সংকলন। ফানোঁকে কেবল একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ, দার্শনিক বা রাজনৈতিক চিন্তাবিদ হিসেবে নয়, বরং পরাধীন মানুষের আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও মুক্তির প্রশ্নে এক অনন্য বিপ্লবী চিন্তক হিসেবে পাঠ করার একটি প্রয়াস এই বই। তাঁর মৃত্যুর বহু দশক পরও ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবাদ, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে ফানোঁর চিন্তা বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। এই সংকলন সেই দীর্ঘ ও চলমান ফানোঁ-পাঠের বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

ফানোঁর চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—পরাধীন মানুষ কীভাবে সত্যিকার অর্থে মুক্ত মানুষ হয়ে উঠবে? তাঁর কাছে স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা, একটি রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তরের নাম নয়। ঔপনিবেশিক শাসন মানুষের ভূখণ্ড দখলের পাশাপাশি তার আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, মানসিকতা ও আত্মমর্যাদাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘদিনের আধিপত্য মানুষের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করে এবং তাকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেই অনিশ্চিত করে তোলে। তাই মুক্তি কেবল রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণ এবং নিজের অস্তিত্বের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

এই বইয়ের বিশেষত্ব হলো—এখানে ফানোঁকে একক কোনো তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়নি। বরং তাঁর জীবন, মনন, রাজনৈতিক দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, মার্ক্সবাদ, ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রাম, জাতীয় সংস্কৃতি, বর্ণবাদ ও বিপ্লবী রাজনীতির বিভিন্ন দিককে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংকলনের প্রথম অংশে ফানোঁকে নিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষক, প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ। তাঁদের আলোচনায় যেমন ফানোঁর চিন্তার মূল সত্তা অনুসন্ধান করা হয়েছে, তেমনি তাঁর সঙ্গে আফ্রিকান ও ক্যারিবীয় চিন্তাধারার সম্পর্ক, তাঁর ওপর সার্ত্র, মার্ক্স, হেগেল ও মার্লো-পন্তির প্রভাব এবং চিন্তার ইতিহাসে তাঁর স্বাতন্ত্র্যও আলোচিত হয়েছে।

সংকলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ফানোঁর চিন্তার সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতার সম্পর্ক অনুসন্ধান করা হয়েছে। পূর্ববাংলার মুক্তির লড়াই, বাংলাদেশের ওপর ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতার প্রভাব এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে ফানোঁর তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বোঝার চেষ্টা রয়েছে। একইভাবে ‘জুলাই পেরিয়ে ফানোঁ’ প্রবন্ধে অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ফানোঁর চিন্তার আলোকে পাঠ করা হয়েছে। ফলে বইটি কেবল একজন বিদেশি চিন্তাবিদকে নিয়ে আলোচনা নয়; বরং নিজেদের ইতিহাস, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন চোখে দেখারও একটি সুযোগ তৈরি করে।

ফানোঁর চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বর্ণবাদ ও মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট। তিনি দেখিয়েছেন, বর্ণবাদ কেবল ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বিষয় নয়; এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত একটি কাঠামোগত বাস্তবতা, যা মানুষের আত্মপরিচয় ও সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক আধিপত্য কীভাবে মানুষের মনে হীনম্মন্যতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করে, এই সংকলনের আলোচনায় তার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতি কীভাবে ঔপনিবেশিকতার অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয় এবং মুক্তিসংগ্রাম কীভাবে নতুন জাতীয় চেতনা ও সংস্কৃতির নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, তাও আলোচিত হয়েছে।

বইটির দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ফানোঁর নিজের লেখা ও গুরুত্বপূর্ণ রচনার বাংলা অনুবাদ। ফলে পাঠক শুধু অন্যদের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ফানোঁকে জানবেন না; সরাসরি তাঁর চিন্তার জগতেও প্রবেশ করতে পারবেন। ‘নিগ্রো ও স্বীকৃতি’, ‘বর্ণবাদ ও সংস্কৃতি’, ‘জাতীয় সংস্কৃতির সহযোগী ক্ষেত্র এবং মুক্তিসংগ্রাম’, ‘উপনিবেশবাদের অবসান এবং স্বাধীনতা’, ‘কেন সশস্ত্র সংগ্রাম?’সহ বিভিন্ন রচনায় ফানোঁ মানুষের মুক্তি, বর্ণবাদ, সংস্কৃতি, সহিংসতা, জাতীয়তাবাদ ও ঔপনিবেশিকতার নানা প্রশ্ন নিয়ে তাঁর মৌলিক অবস্থান তুলে ধরেছেন।

এখানে ফানোঁর মনোবিশ্লেষণী চিন্তারও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। ব্যক্তির মানসিক সংকটকে তিনি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখেননি; বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে প্রচলিত মনোবিশ্লেষণের সীমা অতিক্রম করে উপনিবেশিত মানুষের মানসিক জগত ও সামাজিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিয়েছে। তাঁর এই চিন্তার আলোকে রাষ্ট্র, মানসিক অসুস্থতা, স্মৃতি, বাসনা ও সামাজিক কাঠামোর সম্পর্ক নিয়েও বইটিতে অনুবাদ ও আলোচনা রয়েছে।

ফানোঁর চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা আজ আলজেরিয়া বা আফ্রিকার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিলিস্তিনের চলমান সংগ্রাম, তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, বর্ণবাদ এবং ক্ষমতার অসম সম্পর্ক—সবকিছুর মধ্যেই তাঁর প্রশ্নগুলো নতুনভাবে ফিরে আসে। এই বইয়ে ফানোঁর তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করে ফিলিস্তিনের বাস্তবতাকেও পাঠের চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে পাঠকের সামনে ফানোঁ কেবল অতীতের একজন বিপ্লবী চিন্তাবিদ হিসেবে নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের সংকট বোঝার একটি কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবেও উপস্থিত হন।

এই সংকলনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বৈচিত্র্য। এখানে গবেষণা, বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও অনুবাদ পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। ফানোঁর সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটাতে গিয়ে তাঁর সমসাময়িক ও উত্তরসূরি আফ্রিকান-ক্যারিবীয় চিন্তাবিদদের কথাও এসেছে। রডনি, সি. এল. আর. জেমস, জর্জ প্যাডমোরসহ বিভিন্ন চিন্তাবিদের প্রসঙ্গ ফানোঁর চিন্তার বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে বুঝতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে তাঁর জীবন, বিপ্লবী রাজনীতি ও চিন্তার বিভিন্ন বিতর্কিত দিকও আলোচনার বাইরে রাখা হয়নি।

বাংলা ভাষায় ফ্রানৎস ফানোঁকে পাঠের ক্ষেত্রে এই বই তাই একটি প্রবেশিকা ও সংকলন—দুই-ই। এটি ফানোঁর সম্পূর্ণ চিন্তার শেষ কথা নয়; বরং আরও বিস্তৃত ফানোঁ-পাঠের দরজা খুলে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। বইটির সম্পাদকীয় বক্তব্যেও সেই সীমাবোধ স্পষ্ট—একটি মাত্র বই দিয়ে ফানোঁকে সম্পূর্ণ বোঝা সম্ভব নয়। বরং এই বই নতুন পাঠক ও তরুণ গবেষকদের আরও গভীরভাবে ফানোঁ পড়তে এবং তাঁর চিন্তাকে নিজেদের সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে উৎসাহিত করতে চায়।

ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিশ্লেষণ, ঔপনিবেশিকতা ও মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে আগ্রহী পাঠকের জন্য ‘ফ্রানৎস ফানোঁ: পরাধীন মানুষের মুক্তির দিশারী’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। যারা জানতে চান—পরাধীনতা কীভাবে মানুষের মন ও সমাজকে নির্মাণ করে, মুক্তি কেন শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, এবং একটি জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদা পুনর্নির্মাণের পথে এগিয়ে যায়—তাদের জন্য এই বই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

ফানোঁ বলেছিলেন, প্রতিটি প্রজন্মের সামনে একটি দায়িত্ব থাকে—সে দায়িত্ব পালন করা, অথবা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এই বই সেই দায়িত্বের কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়: মুক্ত মানুষ হওয়ার সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না।


Publisher

গ্রন্থিক প্রকাশন

Language

বাংলা

Country

Bangladesh

Format

হার্ডব্যাক

Edition

1st

First Published

2026

Pages

344

একই বিষয়ের অন্যান্য বই
রিসেন্ট ভিউ বই
Your Dynamic Snippet will be displayed here... This message is displayed because you did not provided both a filter and a template to use.
WhatsApp Icon