অনুবাদ বহুত্ববাদকে শক্তি দেয়; অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে সাহায্য করে বর্তমান যুগ উন্মুক্ততার যুগÑ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার যুগ। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা এযুগের বড় লক্ষ্য। জ্ঞানভিত্তিক অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজের বিকাশে অনুবাদ দরকারি এক উপাদান। একজন মানুষের পক্ষে মাতৃভাষা ছাড়া অনেকগুলো ভাষার দখল না থাকারই কথা। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত ও সুবিধাবঞ্চিত জনপদগুলোতে। সেসব জায়গায় অনুবাদ জ্ঞানের বিকাশে, মতামত গঠনে অগ্রসর ভ‚মিকা রাখে। যে ভাষায় অন্যান্য ভাষা থেকে যত বেশি অনুবাদ হবে সেই ভাষা তত বেশি সমৃদ্ধ। সেখানকার জ্ঞানকাÐ তত বেশি বিকশিত। অনুবাদ বিষয়ে সেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান। সেই সূত্রেই দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোর ভাষাতে অনুবাদের চর্চা বেশি। অনুবাদ একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়। এ রাজনীতির সাথে ক্ষমতার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। যে ভাষার মানুষের সাংস্কৃৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বেশি সেই ভাষার দাপট তত বেশি। তাই দেখা যায় অনুবাদের তত্ত¡ায়ন থেকে শুরু করে অনূদিত সাহিত্যভাÐারের সিংহভাগ ইউরোপীয় এবং আমেরিকান। এক সময়ের অতি শক্তিশালী গ্রিক বা আরবী ভাষার সাহিত্যের অনুবাদ-বাজারে দাপট ও আধিপত্য নেই এখন আর। উল্টো, ক্ষমতা কাঠামোর শক্তির জোরে ইংরেজি, ফরাসি, জর্মান বা স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যের দাপট বিশ^ময়। সে তুলনায় হিন্দি এবং চীনা ভাষায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষ কথা বলা ও সাহিত্য চর্চা করলেও বিশ^ব্যাপী এ দু ভাষার ততটা আধিপত্য নেই এখনও। একইভাবে বলা যায়, আমাদের দেশে বাংলা ভাষার পাশাপাশি গারো, চাকমা, মারমা ভাষাভাষী মানুষ থাকলেও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে এসব ভাষাভাষী মানুষের আধিপত্য নগণ্য হওয়ায় বাংলা থেকে এসব ভাষায় কিংবা এসব ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদের নজির কম। ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব সাংস্কৃতিক-ঔপনিবেশিকতার সাথে জড়িত। দুনিয়া থেকে নানান দেশ, ধর্ম, ভাষা ও জাতির উপনিবেশিক দাপট কমলেও তারা তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে পারছে বা চাইছে অনুবাদের মতো কাজগুলোর মাধ্যমেও। অনুবাদ সাহিত্যে এক ধরনের কুলীনত্বের উপস্থিতি আছে। মনে করা হয় কেবল ব্যাপক পÐিতরাই অনুবাদের যোগ্য। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এখন ইন্টারনেটের যুগে মূল টেক্সট সহজে হাতের নাগালে আসছে। সোস্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বিকল্প প্রচার ও প্রকাশনার সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় অনুবাদের পরিমাণ অনেক। অনুবাদকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক-সামাজিক কুলীনতার কাঠামোর বেশ দুর্দিন চলছে আপাতত। এটা আরও বাড়বে। বাংলা সাহিত্যে অনুবাদের ধারা অতি প্রাচীন। প্রথম পর্যায়ে সংস্কৃত, পরে ফারসি এবং তারও পরে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ হয়েছে বেশি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিদেশি শাসকদের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো এবং ক্ষেত্রবিশেষে পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই এমনটি ঘটেছে। যখন যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তখন সে ভাষার সাহিত্য অনূদিত হয়েছে বেশি মাত্রায়। ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাসও অনুবাদ-অভ্যাসকে প্রভাবিত করেছে। এ অঞ্চলে সংস্কৃত ভাষার প্রধান সাহিত্যকর্মগুলোর সবই অনূদিত হয়েছে বহুদিন। বাঙালী সমাজের বেদ ও কোরান নিজ নিজ ধর্মালম্বীদের অবশ্যপাঠ্য পুস্তক। বেদের সাথে রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ অনেক আগে হলেও কোরানের বাংলা অনুবাদ হয়েছে কিছু পরে। ভাষার বিকাশে অনুবাদ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও বাংলায় এটি কখনও স্বতন্ত্র ও জোরালো ধারা হিসেবে বিকাশ লাভ করেনি। ইদানীং কিছু বিশ^বিদ্যালয়ের সিলেবাসে তা স্থান পাচ্ছে। সরকারিভাবে স্বতন্ত্র অনুবাদ অধ্যয়ন ও চর্চাকেন্দ্র এখন সময়ের দাবি। যে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কাজ হবে নানা ভাষায় পারদর্শী একদল সৃষ্টিশীল গোষ্ঠী গড়ে তোলা যারা বিশ^সাহিত্য জগতে বাংলাসহ দেশের অন্যান্য ভাষার বিস্তৃতি এবং অন্যান্য ভাষার সৃষ্টিকর্ম বাংলায় অনুবাদে ভ‚মিকা রাখবে। অনুবাদের স্বত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পুস্তক অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অনুবাদ করা যায় না। সেক্ষেত্রে অত্যধিক সম্মানির কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে তা প্রদান করে অনুবাদের অনুমতি নেয়াও সম্ভব হয়ে উঠে না। এ কাজটিও করতে পারে প্রতিষ্ঠান। অথচ আমাদের দেশে তারই অভাব। লেখালেখির উঠানের এ সংখ্যায় অনুবাদের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনুবাদ বিষয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে সংখ্যাটিতে। আমাদের দেশের নানা ভাষা থেকে যেমন এখানে কবিতা গল্প অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে তেমনি যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নানা ভাষার কবিতা ও গল্পের অনুবাদ। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কবি-লেখকদের লেখাও স্থান পেয়েছে-পাশাপাশি এসেছে আরব ও প্যালিস্টাইন থেকে শুরু করে চীনা ভাষার লেখার তর্জমা। শহীদুল জহির আর সুবিমল মিশ্রের সাহিত্যকর্মের অনুবাদক তামিলভাষী ভেঙ্কটেশ^র রামাস্বামীর দীর্ঘ আলাপচারিতায় সংখ্যাটিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আমরা চাই এদেশে অনুবাদ সংস্কৃতির নতুন তরঙ্গ। আমাদের এ চাওয়া যতটা সাহিত্যের বিকাশে-তার চেয়েও বেশি সমাজে বহুত্ববাদের বিকাশের জন্য। লেখালেখির উঠান’র আগামী প্রিন্ট সংখ্যার বিষয় সংগীত। এ বিষয়ে সকলের সহযোগীতা কামনা করছি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে সবাইকে শুভেচ্ছা। লেখালেখির উঠান পরিবারের পক্ষে
অনুবাদ সংখ্যা
Writer |
|
Translator |
|
Publisher |
|
Language |
বাংলা |
Country |
Bangladesh |
Format |
পেপারব্যাক |
First Published |
ম্যাগাজিন |
অনুবাদ বহুত্ববাদকে শক্তি দেয়; অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে সাহায্য করে বর্তমান যুগ উন্মুক্ততার যুগÑ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার যুগ। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা এযুগের বড় লক্ষ্য। জ্ঞানভিত্তিক অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজের বিকাশে অনুবাদ দরকারি এক উপাদান। একজন মানুষের পক্ষে মাতৃভাষা ছাড়া অনেকগুলো ভাষার দখল না থাকারই কথা। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত ও সুবিধাবঞ্চিত জনপদগুলোতে। সেসব জায়গায় অনুবাদ জ্ঞানের বিকাশে, মতামত গঠনে অগ্রসর ভ‚মিকা রাখে। যে ভাষায় অন্যান্য ভাষা থেকে যত বেশি অনুবাদ হবে সেই ভাষা তত বেশি সমৃদ্ধ। সেখানকার জ্ঞানকাÐ তত বেশি বিকশিত। অনুবাদ বিষয়ে সেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান। সেই সূত্রেই দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোর ভাষাতে অনুবাদের চর্চা বেশি। অনুবাদ একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়। এ রাজনীতির সাথে ক্ষমতার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। যে ভাষার মানুষের সাংস্কৃৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বেশি সেই ভাষার দাপট তত বেশি। তাই দেখা যায় অনুবাদের তত্ত¡ায়ন থেকে শুরু করে অনূদিত সাহিত্যভাÐারের সিংহভাগ ইউরোপীয় এবং আমেরিকান। এক সময়ের অতি শক্তিশালী গ্রিক বা আরবী ভাষার সাহিত্যের অনুবাদ-বাজারে দাপট ও আধিপত্য নেই এখন আর। উল্টো, ক্ষমতা কাঠামোর শক্তির জোরে ইংরেজি, ফরাসি, জর্মান বা স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যের দাপট বিশ^ময়। সে তুলনায় হিন্দি এবং চীনা ভাষায় ব্যাপক সংখ্যক মানুষ কথা বলা ও সাহিত্য চর্চা করলেও বিশ^ব্যাপী এ দু ভাষার ততটা আধিপত্য নেই এখনও। একইভাবে বলা যায়, আমাদের দেশে বাংলা ভাষার পাশাপাশি গারো, চাকমা, মারমা ভাষাভাষী মানুষ থাকলেও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে এসব ভাষাভাষী মানুষের আধিপত্য নগণ্য হওয়ায় বাংলা থেকে এসব ভাষায় কিংবা এসব ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদের নজির কম। ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব সাংস্কৃতিক-ঔপনিবেশিকতার সাথে জড়িত। দুনিয়া থেকে নানান দেশ, ধর্ম, ভাষা ও জাতির উপনিবেশিক দাপট কমলেও তারা তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে পারছে বা চাইছে অনুবাদের মতো কাজগুলোর মাধ্যমেও। অনুবাদ সাহিত্যে এক ধরনের কুলীনত্বের উপস্থিতি আছে। মনে করা হয় কেবল ব্যাপক পÐিতরাই অনুবাদের যোগ্য। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এখন ইন্টারনেটের যুগে মূল টেক্সট সহজে হাতের নাগালে আসছে। সোস্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বিকল্প প্রচার ও প্রকাশনার সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় অনুবাদের পরিমাণ অনেক। অনুবাদকে ঘিরে থাকা রাজনৈতিক-সামাজিক কুলীনতার কাঠামোর বেশ দুর্দিন চলছে আপাতত। এটা আরও বাড়বে। বাংলা সাহিত্যে অনুবাদের ধারা অতি প্রাচীন। প্রথম পর্যায়ে সংস্কৃত, পরে ফারসি এবং তারও পরে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ হয়েছে বেশি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিদেশি শাসকদের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো এবং ক্ষেত্রবিশেষে পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই এমনটি ঘটেছে। যখন যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তখন সে ভাষার সাহিত্য অনূদিত হয়েছে বেশি মাত্রায়। ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাসও অনুবাদ-অভ্যাসকে প্রভাবিত করেছে। এ অঞ্চলে সংস্কৃত ভাষার প্রধান সাহিত্যকর্মগুলোর সবই অনূদিত হয়েছে বহুদিন। বাঙালী সমাজের বেদ ও কোরান নিজ নিজ ধর্মালম্বীদের অবশ্যপাঠ্য পুস্তক। বেদের সাথে রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ অনেক আগে হলেও কোরানের বাংলা অনুবাদ হয়েছে কিছু পরে। ভাষার বিকাশে অনুবাদ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও বাংলায় এটি কখনও স্বতন্ত্র ও জোরালো ধারা হিসেবে বিকাশ লাভ করেনি। ইদানীং কিছু বিশ^বিদ্যালয়ের সিলেবাসে তা স্থান পাচ্ছে। সরকারিভাবে স্বতন্ত্র অনুবাদ অধ্যয়ন ও চর্চাকেন্দ্র এখন সময়ের দাবি। যে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কাজ হবে নানা ভাষায় পারদর্শী একদল সৃষ্টিশীল গোষ্ঠী গড়ে তোলা যারা বিশ^সাহিত্য জগতে বাংলাসহ দেশের অন্যান্য ভাষার বিস্তৃতি এবং অন্যান্য ভাষার সৃষ্টিকর্ম বাংলায় অনুবাদে ভ‚মিকা রাখবে। অনুবাদের স্বত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পুস্তক অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অনুবাদ করা যায় না। সেক্ষেত্রে অত্যধিক সম্মানির কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে তা প্রদান করে অনুবাদের অনুমতি নেয়াও সম্ভব হয়ে উঠে না। এ কাজটিও করতে পারে প্রতিষ্ঠান। অথচ আমাদের দেশে তারই অভাব। লেখালেখির উঠানের এ সংখ্যায় অনুবাদের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনুবাদ বিষয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে সংখ্যাটিতে। আমাদের দেশের নানা ভাষা থেকে যেমন এখানে কবিতা গল্প অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে তেমনি যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নানা ভাষার কবিতা ও গল্পের অনুবাদ। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কবি-লেখকদের লেখাও স্থান পেয়েছে-পাশাপাশি এসেছে আরব ও প্যালিস্টাইন থেকে শুরু করে চীনা ভাষার লেখার তর্জমা। শহীদুল জহির আর সুবিমল মিশ্রের সাহিত্যকর্মের অনুবাদক তামিলভাষী ভেঙ্কটেশ^র রামাস্বামীর দীর্ঘ আলাপচারিতায় সংখ্যাটিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। আমরা চাই এদেশে অনুবাদ সংস্কৃতির নতুন তরঙ্গ। আমাদের এ চাওয়া যতটা সাহিত্যের বিকাশে-তার চেয়েও বেশি সমাজে বহুত্ববাদের বিকাশের জন্য। লেখালেখির উঠান’র আগামী প্রিন্ট সংখ্যার বিষয় সংগীত। এ বিষয়ে সকলের সহযোগীতা কামনা করছি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে সবাইকে শুভেচ্ছা। লেখালেখির উঠান পরিবারের পক্ষে
Writer |
|
Translator |
|
Publisher |
|
Language |
বাংলা |
Country |
Bangladesh |
Format |
পেপারব্যাক |
First Published |
ম্যাগাজিন |