চলতি বছর ২০২৪ সনের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যাপক ও প্রাণঘাতী গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হয় যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী শাসনের পতন ঘটে। বিগত দেড় দশক থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঁধে চেপে বসা জগদ্দল পাথরের মতো ওই ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ দেশকে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলেছিল। জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করা হয়। ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। চাকুরিক্ষেত্রে কোটা বৈষম্য ও দুর্নীতির কারণে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও মেধা নিদারুণ মার খায়। সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ, সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাট, টাকা পাচার ও ব্যাংকলুটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির মেরুদ- ভেঙে ফেলা হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে নানা বিতর্কিত চুক্তি করে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়। পাশাপাশি, নানা উপায়ে ভয়ের সংস্কৃতি চালু রেখে গণমানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর গুম-খুন-জেল-জুলুমসহ ভয়াবহ উপায়ে নিপীড়ন হয়ে উঠেছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ফলে, আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে সবদিক থেকে নিজ দেশেই নাগরিকরা হয়ে পড়েছিল জুলুমের শিকার-ফেরারি। এমতাবস্থায় ছাত্রসমাজ প্রথমত কোটা সংস্কারের দাবিতে ও পরে সর্বস্তরের মানুষ যুক্ত হয়ে বৈষম্য, দুর্নীতি ও জুলুমের অবসানে এক সর্বাত্মক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার দলীয় ক্যাডার-মাস্তানদের সশস্ত্র আক্রমণের ফলে ওই অভ্যুত্থানে সহ¯্রাধিক মানুষ মারা যায়। এমনকি হেলিকপ্টার গানশিপ থেকেও ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করা হয়। গুরুতর আহত হয় কয়েক হাজার মানুষ যার মধ্যে মায়ের কোলে থাকা শিশুরাও বাদ ছিল না। ফলে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতন নিশ্চিত হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।
রাজপথে যখন ছাত্র-জনতার মিছিল-মিটিং-আন্দোলন চলছিল, পাশাপাশি দেয়ালে দেয়ালে চলছিল প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্র আঁকা। বিশেষভাবে ফ্যাসিবাদ পতনের পর সারা দেশের দেয়ালগুলোতে তরুণ-তরুণীরা লিখন ও চিত্রের মাধ্যমে অভ্যুত্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির পরম্পরা এবং তাদের স্বপ্নের কথা তুলে ধরতে থাকে প্রায় মাসজুড়ে। সত্যিকার অর্থে দেয়ালগুলিই হয়ে ওঠে জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও আকাক্সিক্ষত বাংলাদেশের মহাকাব্য। মননরেখায় এবারের সংখ্যার প্রয়াস তাই দেয়ালের এইসব ভাষা-চিত্রের নির্বাচিত বর্ণনা-বিশ্লেষণ। গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রগুলো আর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অধিকাংশ প্রবন্ধ রচয়িতা থেকে কয়জন এবার অঙ্কনশিল্পী ও অঙ্কনবিশারদ। এর বাইরেও অনেকে আছেন যাঁরা আর্টের সঙ্গে গণআন্দোলনকে যুক্ত করে চিন্তা করেন।
দেয়ালের এই মহাকাব্যের ভাব-চিত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চিন্তা মাথায় আসে সেপ্টেম্বর মাসের এক সকালে-ঢাকায়। এরপর কালক্ষেপণ না করে প্রথমেই শুরু হয় গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রগুলোর ছবি তোলার আয়োজন। ইতিমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে কিছু গ্রাফিতি মুছে ফেলা হচ্ছিল। সুতরাং মননরেখার অনুরোধে দুই গুণী ফটোগ্রাফার মৃত্তিকা গাইন ও পূজন চন্দ্র শর্মা ঝটপট নেমে পড়লেন ঢাকার রাস্তায়। গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালগুলোর ছবি তোলা হলো। ডকুমেন্টরি ফিল্ম মেকার ও ফটোগ্রাফার অভিজিৎ শুভ ছুট দিলো চট্টগ্রামে। আট দশদিন ধরে ক্যামেরার কাজ চলতে থাকল। পাশাপাশি, জেলায় জেলায় এমনকি মফস্বলে যেখানে যেখানে সম্ভব, ছবি তোলার কাজ চলতে থাকল। এরই মাঝে চলল টেক্সটের পরিকল্পনা। বিশেষ বিষয়ের লেখা বলে সীমিতসংখ্যক কিছু মানুষের উপর নির্ভর করতে হলো।
‘দেয়ালের লিখন, বার বার খ-ন’ শিরোনামে নাঈম মোহায়মেনের লেখাটি দিয়েই এই সংখ্যার শুরু। যুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থান, গণ আন্দোলন বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গণমানুষের বিকল্প ছবি-ভাষা কীভাবে সত্য নির্মাণ করে; প্র্রাতিষ্ঠানিক ভাষা-ব্যাকরণকে পালটে দেয় এবং তার উপর চড়াও হয়, ভাষার শ্লীল-অশ্লীলের ভেদরেখাকে উপড়ে দিতে চায়-তার একটি দুর্দান্ত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তিনি এই লেখায় করেছেন। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কিছু নির্বাচিত দেয়ালচিত্রের ন্যারেটিভও রয়েছে। শিবলী নোমানের লেখাটিতে গণঅভ্যুত্থানের সামাজিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ ও দেয়ালচিত্র নিয়ে নাতিদীর্ঘ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলাপ রয়েছে। গণআন্দোলনে জনগণের সাংস্কৃতিক চর্চা ও তার বহিঃপ্রকাশের এক সম্মিলিত প্রয়াস দেশজুড়ে আঁকা গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রগুলোতে ফুটে উঠেছে। সময়ের ব্যবধানে আন্দোলনের গণচরিত্র কিছুটা বদলে যেতে থাকলেও এই দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতিগুলোই শক্তিশালী উপাদান হিসেবে সকলের চোখের সামনে উপস্থিত।
আর্টিস্ট ও লেখক দেবাশিস চক্রবর্তী দীর্ঘ পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন মিডিয়া ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বিষয়ে অসংখ্য ইমেজ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর আঁকা ছবিগুলো আন্দোলনের দিনগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রভাববিস্তারকারী ভিজ্যুয়াল হিসেবে কাজ করে। তিনি এই সংখ্যার জন্য একটি প্রবন্ধ দিয়েছেন যেখানে চব্বিশের গণআন্দোলন নিয়ে করা তাঁর কাজের দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।
কানাডার টরেন্টো থেকে অনুবাদক ও সাহিত্য সংগঠক ফারহানা আজিম শিউলী এ মাসেই শিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তী ও লেখক সুহান রিজওয়ানকে নিয়ে তার সংগঠন ‘পাঠশালা’র অনলাইন প্লাটফর্মে বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান করেন। সেই অনুষ্ঠানটি নিয়ে লেখা তার প্রবন্ধটি তিনি মননরেখার এই সংখ্যায় ছাপানোর জন্য দিয়েছেন। বাংলাদেশের গ্রাফিতি নিয়ে সমৃদ্ধ আলাপ করেছেন গ্রাফিতি বিশেষজ্ঞ মানস চৌধুরী ও আর্টিস্ট আরাফাত করিম। মানস চৌধুরীর ভাষ্যে বাংলাদেশে গণআন্দোলন ও সামাজিক অসন্তোষ থেকে শুরু করে বৈশি^ক প্রেক্ষিতে গ্রাফিতি চর্চা বিষয়ে নিগূঢ় বিশ্লেষণ পাঠক পাবেন। আর্টিস্ট আরাফাত করিমের সঙ্গে আলাপচারিতাটি তাঁর গ্রাফিতি আঁকা নিয়ে চমকপ্রদ কিছু তথ্য দেবে এবং আর্টিস্ট হিসেবে গ্রাফিতি নিয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরবে।
আর্টিস্ট রাজীব দত্তের একটি লেখা আছে এই সংখ্যায় যাতে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে শুধু নয় সার্বিকভাবেই বাংলাদেশের গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের উপর আলোকপাত করেছেন। ব্যক্তি রাজীবের উদার ও বিনয়ী মানসিকতায় আমরা মুগ্ধ হয়েছি। সংখ্যাটির শুরু থেকে তিনি আমাদের সংখ্যাটি প্রকাশে নানা সহযোগিতা করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়ে কাজটিকে সহজ করে দিয়েছেন। এককথায় তিনি একজন বড়ো মনের মানুষ। আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।
এবারের গ্রাফিতিতে বিচিত্র সব বিষয় উঠে এসেছে যা লোকমানসের আড়ালে চলে গিয়েছিল। এমনকি রাষ্ট্রীয় জুলুমের ভয়েও অনেকে এসব বিষয় তুলে ধরতে পারেন নি। কিন্তু ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না যার প্রমাণ এবার সারাদেশজুড়ে গ্রাফিতিতে কল্পনা চাকমা, সিরাজ সিকদার, ফেলানী, চা শ্রমিক, পাহাড়, সীমান্ত হত্যাকা- এসব বিষয় উঠে আসা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকা- একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলমান এই মানবিক সমস্যাটি নিরসনে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের টনক নড়ছে না। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকা-ের তালিকা বেড়েই চলছে। এই সমস্যাটি তুলে ধরেছেন সীমান্ত গবেষক ড. ছালেহ মুহাম্মাদ শাহরিয়ার। কল্পনা চাকমাকে নিয়ে লেখা মুক্তাশ্রী চাকমা সাথীর নাতিদীর্ঘ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা রয়েছে। মাসুদুল হক লিখেছেন সমতলের আদিবাসীদের নিয়ে। পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জীবনের বঞ্চনা-বৈষম্যের বিবরণ এ দুটি লেখায় পাঠক পাবেন।
পশ্চিমবঙ্গের এই সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ও সাহিত্য সংগঠক কণিষ্ক ভট্টাচার্য। সম্প্রতি ৯ আগস্ট কলকাতার আর.জি.কর হাসপাতালের একজন মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনা সৃষ্ট বিক্ষুব্ধ সামাজিক আন্দোলন নিয়ে তিনি মননরেখার এই সংখ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। কোচবিহার থেকে লিখেছেন লেখক সুবীর সরকার। তিনিও অন্যান্য প্রসঙ্গের সাথে কলকাতার আর.জি.কর এর ঘটনা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের পাশ^বর্তী দেশ ভারতের কলকাতায় এই নৃশংসতম ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছিল বাংলাদেশে সরকার পতনের ৪ দিন পর। এমনকি ওই আন্দেলন তীব্রতর হয়েছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের প্রেরণায়। ফলে উপমহাদেশে গণ-আন্দোলনের প্রকৃতি বোঝার জন্য এই পাঠগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রাফিতি বা দেয়ালের ভাষা বিশ^ব্যাপী সামাজিক অসন্তোষ ও প্রতিবাদ প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। সম্প্রতি সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ যুগের অবসানেও একটি গ্রাফিতি-প্রধান ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের দারা এলাকার একটি সড়কে সায়সানেহ নামের এক কিশোর স্প্রে করে লিখেন, ‘এজাক এল দরজা, ইয়া ডাক্তার’। যার অর্থ ‘এবার আপনার পালা ডাক্তার’। মূলত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে নিশানা করে এ গ্রাফিতি আঁকেন তিনি। ওই গ্রাফিতি সিরিয়ার জাতীয় বিদ্রোহের স্মারক হয়ে ওঠে। এটি আঁকার কারণে পুলিশি হয়রানির শিকার হন মুয়াবিয়া ও তার বন্ধুরা। গোপনে পুলিশ তাদের ২৬ দিন আটকে রাখে। তাদের ওপর নির্যাতনের কারণে দারার বাসিন্দারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরবর্তীসময়ে কেবল দারা নয়, পুরো সিরিয়াতেই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। আসাদ শাসনের অবসানের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আসাদ রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে সিরিয়া ত্যাগে বাধ্য হন।
মননরেখার এই সংখ্যা গ্রাফিতি প্রসঙ্গে বিশ^ পরিসরেও নজর দিয়েছিল। বিশেষ করে ব্যাঙ্কসি প্রসঙ্গে। ব্যাঙ্কসিÑ এক নাম, যা শিল্পজগতে রহস্য আর প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর পরিচয় যেন ধোঁয়াশায় ঢাকা, কিন্তু তাঁর শিল্পের ভাষা স্পষ্ট-শক্তিশালী, বিদ্রোহী, এবং সমাজসচেতন। ব্যাঙ্কসি মূলত স্ট্রিট আর্টিস্ট। শহরের দেয়াল, রাস্তার কোণা কিংবা ভাঙা ভবনের ধ্বংসাবশেষে তাঁর আঁকা ছবিগুলো এক নতুন ভাষায় কথা বলে। এটি নিছক আর্ট নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তা, সামাজিক বিদ্রোহ, এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এক সূক্ষ¥ কিন্তু তীক্ষè প্রতিরোধ। তাঁর পরিচয় অজানা হলেও, তাঁর কাজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ব্রিস্টল থেকে শুরু করে প্যারিস, নিউইয়র্ক থেকে বেথলেহেমÑব্যাঙ্কসির শিল্প যেন এক নিঃশব্দ আন্দোলন। ক্ষমতার কাঠামো, যুদ্ধ, ভোক্তাবাদ, এবং অভিবাসনের মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলো তার কাজের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশেষ করে, তার বিখ্যাত এরৎষ রিঃয ধ ইধষষড়ড়হ কিংবা বেথলেহেমের ডধষষবফ ঙভভ ঐড়ঃবষ শুধু শিল্প নয়, বরং বিশ্বব্যাপী মানুষের আবেগের প্রতিফলন ঘটায়।
ব্যাঙ্কসির শিল্প নিয়ে প্রশ্ন অনেকÑকেন তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখেন? তার কাজ কি কেবল বিদ্রোহ, নাকি সিস্টেমেরই অংশ? কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাঁর শিল্পকে অনুভব করা। ব্যাঙ্কসি আমাদের চোখের সামনে এক নতুন দৃষ্টিকোণ এনে দেন-যেখানে শিল্প শুধু দেয়ালে আটকে থাকে না, বরং সমাজের মেরুদ- নাড়া দেয়। তাই ব্যাঙ্কসিকে ছাড়া আধুনিক দুনিয়ার গ্রাফিতি নিয়ে আলাপ করার চেষ্টা সবসময়ই অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। সত্যিকার অর্থে গ্রাফিতি শিকারিদের কাছে গ্রাফিতি ও ব্যাঙ্কসি যেন সমার্থক হয়ে আছে। এই সংখ্যায় অনেকে তাদের লেখাতেও ব্যাঙ্কসির কিছু ছবি যুক্ত করে দিয়েছেন। ব্যাঙ্কসিকে নিয়ে লেখা শিক্ষক-শিল্পী আবুল মনসুরের লেখা একটি প্রবন্ধ লেখকের অনুমতি নিয়ে পুনঃপ্রকাশ করা হলো। ব্যাঙ্কসির নামে করা দুটি ইন্টারভিউ অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে ইমরান ফিরদাউস ও সুবর্ণ ধর।
কাজ করতে করতেই এক পর্যয়ে ব্যাঙ্কসির অরিজিনাল গ্রাফিতির ছবি ক্যামেরায় তোলার আকাক্সক্ষা পেয়ে বসল। কৌতূহল জাগল, ব্যাঙ্কসির নিজ শহর ব্রিস্টলের দেয়ালে খুঁজলে কি কিছু গ্রাফিতি পাওয়া যাবে? লন্ডনের সুইন্ডনে বসবাসরত লেখিকা বন্ধু লুনা রাহনুমার কাছে আলাপ তুলতেই রাজি। সব পাকা করা হলোÑ লুনা ব্যাঙ্কসির খোঁজে ব্যাঙ্কসির নিজ শহর ব্রিস্টলে যাবেন। ইতিমধ্যে অনলাইনে ব্যাঙ্কসি সম্পর্কে তিনি কিছু পড়াশুনাও করে নিলেন। গুগলে স্পট ফাইন্ডিং হলো। বাধ সাধলো আবহাওয়াÑ সেখানে তখন ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ঝড়-বৃষ্টি চলছিল। কিন্তু তিনি দমবার মানুষ নন। পরের সপ্তাহে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ছুটলেন ব্রিস্টলে। সেদিন ওই শহরে আলোঝলমলে দিন। দুইতিনদিন পরে পাঠালেন তাঁর ক্যামেরায় তোলা ব্যাঙ্কসির আঁকা অরিজিনাল কিছু গ্রাফিতির ¯œ্যাপ। ছবির সঙ্গে তাঁর জার্নিটাও লিখে দিলেন। জানা গেল, সম্পাদকের অনুরোধ শুধু নয় নিজ কৌতূহল মেটাতেও গভীর রাত পর্যন্ত ব্রিস্টলের পথে পথে ছুটে বেরিয়েছেন। এতে খানিক বিরক্ত হয়েছে তার সঙ্গে যাওয়া মেয়েদুটো, হয়তো বা তার স্বামীওÑ বারবার গাড়ি থামতে হয়েছে বলে। কিন্তু লুনা ভ্রƒক্ষেপ করেননি। আমরা তাঁর এবং তাঁর পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
বিশেষ বিষয়ের কাজ বলে লেখক নির্বাচন করতে হয়েছে সীমিত পরিসরে, তাও আবার লেখা দিতে চেয়ে শেষপর্যায়ে এসে দুইচার জন দিলেন না। ফলে সেই ঘাটতি পূরণের আর কোনো সুযোগ থাকল না। বর্তমান বাস্তবতায় লিটলম্যাগাজিনগুলোর লেখা পাওয়া ও অর্থ জোগাড় ভয়াবহ এক সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। সবকিছু কর্পোরেট মিডিয়াহাউজগুলোর নিয়ন্ত্রণে। সিংহভাগ প্রতিষ্ঠিত শিল্পী-সাহিত্যিক-লেখকরা সেই বলয়েই কলমের চর্চা করেন-মুখে যত কথাই বলা হোক না কেন। সুতরাং এর বাইরে অবস্থান নিয়ে টিকে থাকা বড়ো চ্যালেঞ্জ। এরপরও আমরা চেষ্টা করেছি বাংলাদেশ তথা বিশে^র সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নাগরিক ভাবনা ও আকাক্সক্ষার শিল্পবৃত্তান্ত এই সংখ্যায় খানিকটা তুলে ধরতে। কিছু না করতে পারার চেয়ে যা পারলাম তা করে কালের দায় খানিকটা মিটাতে পারলামÑএটাই বড়ো কথা।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা। দেয়ালে খচিত দ্রোহের বার্তাগুলো অনুধাবন করে সরকার গণমানুষের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করার যথাযথ উদ্যোগ নিবেÑ এটা বাংলাদেশের চাওয়া। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হোক।
সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।