মূল লেখা শুরু হওয়ার আগে, গ্রন্থটির বিষয়ে কিছু প্রাথমিক কথা বলে নেওয়া জরুরি। যদিও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই লেখার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত, তবু কোনও ভাবেই লেখাটি বিদ্যাসাগরের ‘জীবনী’ নয়। বস্তুতপক্ষে তাঁকে নিয়ে এত অসংখ্য ছোট-বড় জীবনী রচিত হয়েছে যে, নতুন করে তার পুনরাবৃত্তির কোনও অর্থ অন্তত আমি খুঁজে পাইনি।
একই কারণে এই লেখা কেবল বিদ্যাসাগর-কেন্দ্রিকও নয়। কারণ বিদ্যাসাগরের জন্মের বহু পূর্বের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির উল্লেখ ও বিশ্লেষণ না করলে তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব নয় যে সময়ে তিনি প্রায় নিষ্ক্রিয়, সেই সময়কালীন ইতিহাসে অগণিত বাঁকবদলের অনুল্লেখও। কারণ সেই ইতিহাসের নানাবিধ জটিল বিন্যাস উন্মোচিত না হলে, লেখাটির প্রবলভাবে গতানুগতিক হয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা আছে।
তাই এই লেখায় ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যাপ্ত এক বিশাল ইতিহাস উল্লিখিত হয়েছে। বিদ্যাসাগরের প্রয়াণবর্ষে রচিত হয়েছিল শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন-এর বিদ্যাসাগর-জীবনচরিত।
পরবর্তীকালে যে অসংখ্য বিদ্যাসাগর-জীবনী রচিত হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল যথাক্রমে — চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিদ্যাসাগর (জ্যৈষ্ঠ ১৩০২, ১৮৯৫), বিহারীলাল সরকার-এর বিদ্যাসাগর (আশ্বিন ১৩০২, ১৮৯৫ ), সুবল চন্দ্র মিত্র-এর Isvar Chandra Vidyasagar: Story of His Life and Work (১৯০২), বিনয় ঘোষ-এর বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ (কার্তিক ১৩৬৪-ভাদ্র ১৩৬৬), ইন্দ্রমিত্র-এর করুণাসাগর বিদ্যাসাগর (১৯৬৯), ব্রায়ান হ্যাচার-এর Vidyasagar: The Life and After-life of an Eminent Indian (২০১৪) এবং ফ্রাঁস ভট্টাচার্য-এর Pandit Iswarchandra Vidyasagar (২০১৯)।
বিদ্যাসাগরের প্রাথমিক চার জন জীবনীকারের মধ্যে খুবই অকিঞ্চিৎকর তথ্যসূত্র হিসেবে বিহারীলাল সরকার গোটা লেখাটিতে সাকুল্যে দু-একবার উল্লিখিত হয়েছেন। কয়েকটি ইংরেজি চিঠির প্রসঙ্গ ছাড়া চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুবল চন্দ্র মিত্র উল্লিখিত হননি। তবে বিদ্যাসাগরের জীবনের নানা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সুবাদে এবং তাঁর পরবর্তী তিন গ্রন্থকার মূলত সেই গ্রন্থটিকে আকর গ্রন্থ বিবেচনা করার কারণে, বিদ্যাসাগর-সহোদর শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রণীত গ্রন্থটির বহু তথ্য এই লেখাটিতে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই লেখায় বিদ্যাসাগরের জীবনের নানা ঘটনার জন্য আমি প্রধানত দুই পরিশ্রমী বিদ্যাসাগর-গবেষক বিনয় ঘোষ ও ইন্দ্রমিত্র-এর গ্রন্থ দুটির ওপর নির্ভরশীল হয়েছি। বলা বাহুল্য, অনেক ক্ষেত্রেই বিনয় ঘোষের বিশ্লেষণের সঙ্গে সহমত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। ইন্দ্রমিত্র-এর গ্রন্থটিতে কোনও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ না থাকায়, সে প্রসঙ্গটি অবান্তর।
নিছক জীবনীগ্রন্থ না হলেও এই লেখায় গৃহীত হয়েছে অশোক সেন-এর Iswar Chandra Vidyasagar and His Elusive Milestones (১৯৭৭) এবং স্বপন বসু-র সমকালে বিদ্যাসাগর (১৯৯৩) গ্রন্থ দুটির নানা মূল্যবান তথ্য। বিদ্যাসাগরের শিক্ষাসংক্রান্ত নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুর জন্য ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ক্ষীণতনু গ্রন্থ বিদ্যাসাগর-প্রসঙ্গ (১৩৩৮)-কে প্রায় আকর গ্রন্থের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।