আমি আমার জীবনের একটা বড় সময় পর্যন্ত যতকিছু পড়েছি সারফেজ থেকে পড়েছি। মানে পড়ে গেছি কিন্তু গভীরে যাই নাই। সন্ত কবীরের একটা সুন্দর কথা আছে। পড়ে পণ্ডিত হওয়া যায় না, আড়াই অক্ষরের শব্দ প্রেম, প্রেম করতে পারলে পণ্ডিত হইতে পারবে। প্রেম আমি করতে চাই না পণ্ডিতও আমি হতে চাইনা তবে এই কথার এসেন্স বুঝি। ভালোবাসা দিয়ে পড়লে প্রতিটা গল্পের ভেতরে আরেকটা গোপন গল্প বের হয়ে আসে।
মারেফতের সাথে আমার পরিচয় সম্ভবত এই ভালোবাসার সূত্র ধরেই। রবীন্দ্রনাথ একজন সুফি কবি, নজরুল একজন সুফি কবি। তাঁদের লিটারেচার আমাদের ঠোঁটে লেগে আছে। কিন্তু টেক্সটের ভেতরের মরমে ঢুকলে এই লিটারেচারগুলো আলাদা গল্প বলতে চায়। এআর রহমানের 'কুন ফায়া কুন' কিংবা আতিফ আসলামের 'তাজদারে হারাম'। গান হিসেবে শুনতে দারুণ, কিন্তু অর্থের গভীরে গেলে আরও একটা দুনিয়া খোঁজ পাওয়া যায়। এক রঙ্গমিস্তিরির খবর পাওয়া যায়। রমেশ শীলের গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী যে স্কুল খুলেছেন সেই লিরিক আমাদের মুখে মুখে, কিন্তু সিনায় সিনায় লেখা পড়ার বিষয়টা বুঝলে মন্দ লাগবে না আপনার।
এম্পেথি সিরিজের সুফিবাদের সারফেজ লেভেলের আলাপচারিতার এই সংস্করণে আপনাদের স্বাগতম। ভূমিকার একেবারে শুরুতেই বলে নিচ্ছি এই বই একেবারে সারফেজ লেভেলের বিষয় নিয়ে খুবই কাঁচা বোঝাপড়ায়ে ওপর ভিত্তি করে লেখা। সুফিবাদ নিয়ে আমার আগ্রহের কমতি নাই। একটু ভেতর থেকে বোঝার জন্য বহুদিন ধরেই চেষ্টা করছি। এই বইটাকে সেই জানাবোঝার পথে আমার একটা ডায়েরি বলতে পারেন। অনেক মতের, অনেক পথের মানুষদের কথা থেকে, লেখা থেকে যা বুঝেছি, নিজের মতো লিখেছি। পবিত্র কোরআন ও রাসূল (সাঃ)-এর হাদীস মোবারক থেকে এখানে অনেক উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছি। আমি যেহেতু ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত নই তাই অনেক ভুল করে থাকতে পারি। এসব ভুলের জন্য আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
তবে এই বইটা কেবল তত্ত্বকথা বা আধ্যাত্মিক সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য লিখিনি। এর পেছনে একটা সমকালীন দগদগে ক্ষত কাজ করছে। গত এক বছরে আমাদের দেশে শতাধিক মাজার-দরবার, সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত আস্তানায় আক্রমণ করা হয়েছে, ভাঙা হয়েছে। কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে সাধক নূরাল পাগলের লাশ।
আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ, বিশেষ করে যারা নিজেদের 'অক্ষরপন্থী' বা কিতাবের আক্ষরিক অর্থের অনুসারী মনে করেন, তারা তরিকতপন্থীদের বা মারেফতের এই জগতটাকে মনে করেন চূড়ান্ত অযৌক্তিক এবং শিরক-কুফরের আখড়া। তারা মনে করেন, ইট-পাথরের এই মাজারগুলো অপসারিত করলেই ধর্ম রক্ষা পাবে। এই বই সেই 'অযৌক্তিক' বলে দেগে দেওয়া জগতের ভেতরের এক গভীর লজিক বা 'আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান' খোঁজার ক্ষুদ্র এক প্রচেষ্টা। রিচার্ড ইটন বা অসীম রায়ের মতো গবেষকরা দেখিয়েছেন- বাংলার এই পলিমাটিতে ইসলাম তলোয়ারের জোরে আসেনি, এসেছে একদল 'উদ্যোক্তা পীর'-এর হাত ধরে, যারা জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদি জমি বানিয়েছেন এবং মানুষের আধ্যাত্মিক ক্ষুধার পাশাপাশি পার্থিব নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আজ যখন মাজার ভাঙা হয়, তখন আসলে সেই শেকড়টাকেই উপড়ে ফেলার চেষ্টা চলে।
এই বইতে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি, লালন যখন বলেন 'আরশি নগর' বা নজরুল যখন বলেন 'মীমের পর্দা', তা কোনো বিমূর্ত কবিতা নয়; বরং তা হচ্ছে নিজের 'ইগো' বা 'আমিত্ব'কে চেনার এক শক্তিশালী সাইকোলজি। সুফিবাদের মূল লড়াইটা বাইরে নয়, বরং নিজের ভেতরের সেই 'স্বৈরশাসক' নফসের বিরুদ্ধে।
মারেফতের এই পথ আমাদের 'কগনিটিভ এম্প্যাথি'র সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যায়। যখন কেউ উপলব্ধি করে যে— স্রষ্টা তার নিজের শাহরগের চেয়েও কাছে এবং প্রতিটি মানুষের হৃদয়েই সেই 'একই অস্তিত্বের' প্রতিফলন, তখন সে আর অন্য কাউকে ঘৃণা করতে পারে না। তখন আর মন্দির-মসজিদ-মাজার আলাদা থাকে না, প্রতিটি মানুষই হয়ে ওঠে একেকটি ফুলের বাগান।
অক্ষরপন্থিরা যখন মারেফতকে আক্রমণ করে, তারা আসলে সেই 'মরমী রাজনীতি'কে ভয় পায় যা মানুষকে অন্ধ আনুগত্য থেকে মুক্তি দিয়ে নিজের ভেতরের 'সিমুর্গ' বা ঐশ্বরিক সত্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমি চাই এই বইটা পড়ে পাঠক একবারের জন্য হলেও ভাবুক কেন কিছু মানুষ পাগল বা মজ্জুব হয়ে ঘুরে বেড়ায়? কেন মজনুর মতো লায়লার গলি পাহারা দেয়? কেন একজন মানুষ নিজের সব দাঁত ভেঙে ওয়ায়স করনী হতে চায়? কেন মনসুর হাল্লাজ হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে 'আনাল হক' উচ্চারণ করেন?
'মারেফতের একগুচ্ছ গোলাপ' কোনো প্রচারপত্র নয়। এটি সহজিয়া ঢঙে ধর্মের আড়ালে থাকা সেই আদিম ও অকৃত্রিম প্রেমের গল্প, যা মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে শেখায়। দিনশেষে ইট-পাথরের মাজার ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকা যে মারেফতি প্রেম, তাকে উপড়ানোর মতো তলোয়ার বা হাতুড়ি আজ পর্যন্ত কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি।
আসুন, অন্যের আস্তানা নয়, আমরা আমাদের ভেতরের অন্ধকারের দেয়ালগুলো ভাঙি। নিজের ভেতরের সত্যকে চেনার এই অগোছালো যাত্রায় এম্পেথি সিরিজের নতুন পর্বে আপনাকে আরও একবার স্বাগতম।
আরিফ রহমান
ইব্রাহীমপুর, ঢাকা।















