বাংলার কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে ইলা মিত্র এক অনন্য নাম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় শুরু হওয়া কৃষক আন্দোলন পাকিস্তান আমলেও অব্যাহত ছিল, আর তারই ধারাবাহিকতায় তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন ইলা মিত্র। এই নাটকটি সেই লড়াই ও সংগ্রামের এক বিস্তৃত উপাখ্যান, যেখানে উঠে এসেছে এক নারীর অসামান্য সাহস, নেতৃত্ব এবং ত্যাগের কাহিনি।
প্রশান্ত হালদারের রচিত নাটক ‘ইলা’ শুধু ইতিহাসের পুনর্কথন নয়, বরং এটি এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের নাট্যরূপ। নাটকের কাহিনি ইলা মিত্রের সংগ্রামী জীবনকে কল্পনাশক্তি ও গবেষণালব্ধ তথ্যের সংমিশ্রণে রচনা করেছে। এখানে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে এক তরুণী তাঁর সামাজিক ও পারিবারিক বলয়ের সীমানা পেরিয়ে কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে এবং কৃষকদের মধ্যে নতুন চেতনার জন্ম দেয়।
নাটকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি সরল ক্রমানুসারে লেখা হয়নি। বরং কল্পনাপ্রসূত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে নানাভাবে যাতায়াত করে দর্শক ও পাঠককে ঘটনাবলির গভীরে নিয়ে যায়। ইলা মিত্রের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর ওপর হওয়া নির্মম অত্যাচার—সবকিছুই এখানে সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর সংগ্রামের প্রতি কৃষকদের অবিচল আস্থা এবং রাষ্ট্রের নিপীড়ন তাঁর চরিত্রকে আরও দৃঢ় এবং অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে।
এই নাটকে আমরা দেখবো, কীভাবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কমিউনিস্ট, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ভয় ও বিদ্বেষের রাজনীতি চালিয়েছে। ইলা মিত্রের ওপর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ পড়তে গিয়েও চোখ ভিজে আসে, হাত মুঠো হয়ে আসে। একইসঙ্গে নাটকটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শোষিতদের সংগ্রাম কখনোই বৃথা যায় না।
ইলার সংগ্রাম শুধুমাত্র রাজনৈতিক ছিল না, এটি ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধেরও একটি অধ্যায়। এই নাটকটি সেই ইতিহাসকে রক্ষা করে, নতুন প্রজন্মের সামনে তা তুলে ধরে। নাট্যকার প্রশান্ত হালদারকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি আমাদের সামনে ইলার জীবনকে নতুনভাবে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন।
‘ইলা’ শুধু এক নারীর জীবনের গল্প নয়, এটি সমগ্র পূর্ব বাংলার কৃষক ও নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। এই নাটকটি দ্রুত মঞ্চায়িত হবে এবং দর্শকদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করবে, সেই প্রত্যাশায় ভূমিকার ইতি টানলাম।