ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান: অন্তর্বর্তী ভাবনা বইটির অধিকাংশ নিবন্ধ আগস্ট পরবর্তী সময়ে লেখা। নিবন্ধগুলোতে সমসাময়িক বিতর্কের পরিষ্কার ছাপ রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কারের অভিমুখ নির্ধারণ করার দিকেই আমার প্রধান মনোযোগ ছিল। সরকার, রাষ্ট্র, জনগণ, সংবিধান, নির্বাচন, গণপরিষদ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এ বইয়ে আলোচিত হয়েছে।
স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও কেন বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে যায়, এই প্রশ্ন ছিল আমার অন্যতম কেন্দ্রীয় অনুসন্ধানের বিষয়। এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পশ্চাদপদ ও গণবিরোধী ধারণার সমালোচনা করতে হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত গণপরিষদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের ধ্রুপদী পথ। অথচ দেখা যাচ্ছে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার নামে গণঅভ্যুত্থানকে নিছক রেজিম পরিবর্তনে সংকুচিত করা হচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের মতো বিরাট ঐতিহাসিক বাঁকবদলের মুহূর্তকে স্রেফ ক্ষমতার হাতবদলের মধ্য দিয়ে ছেঁটে ফেলা নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখার অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে এই ভুল থেকে রক্ষা করতে হবে।
সর্বিক পরিস্থিতি বিচারে বর্তমানে রাজনীতিতে দুটি প্যারাডাইম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে জুলাইয়ের ‘গণঅভ্যুত্থান প্যারাডাইম’, অন্যদিকে জানুয়ারির ‘রেজিম পরিবর্তন প্যারাডাইম’। বিদ্যমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর তথা জানুয়ারি প্যারাডাইম ব্যর্থ হওয়ার পর জুলাই প্যারাডাইম হাজির ও সফল হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অপসারণ প্রশ্ন সামনে আসার পর দেখা গেল, গণঅভ্যুত্থানকে স্রেফ ক্ষমতার হাত বদলে সংকুচিত করার তৎপরতার মাধ্যমে জানুয়ারি প্যারাডাইম শক্তি সঞ্চয় করতে চাইছে।গণঅভ্যুত্থানের পরের কাজ হচ্ছে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু রেজিম পরিবর্তন প্যারাডাইম গণঅভ্যুত্থানকে সংবিধানের ভেতর এঁটে দিয়ে, বিদ্যমান ব্যবস্থা, সংবিধান অক্ষুণ্ন রেখে স্রেফ নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়। এ কাজ হবে গণঅভ্যুত্থানের সাথে মস্ত বড় বেঈমানি।