এই গ্রন্থটি বিগত পাঁচ–ছয় বছরে রচিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের সংকলন। এখানে পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—এই তিনটি আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তকে একত্রে পাঠ করার চেষ্টা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য কোনো ধারাবিবরণী লেখা নয়; বরং এই ঘটনাগুলোর চারপাশে নির্মিত আধিপত্যশীল জাতীয়তাবাদী বয়ানের ইতিহাস, রাজনীতি ও সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
বিগত পনের বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় রাষ্ট্র-সমর্থিত এক ধরনের ‘দলীয় বয়ান’ প্রাধান্য পেয়েছে, যেখানে ইতিহাসকে অনুসন্ধানের বিষয় না বানিয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রবণতা স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিই গ্রন্থটির প্রবন্ধসমূহ রচনার প্রধান প্রেরণা। এখানে দেখানো হয়েছে, ইতিহাস সবসময় বয়ান আকারেই আমাদের সামনে হাজির হয়, কিন্তু কোনো বয়ানই পূর্ণ ইতিহাস নয়; বরং তা বর্তমানের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে অতীতকে নির্বাচন, গুরুত্বায়ন ও ব্যাখ্যার ফল। ফলে ইতিহাসের নামে প্রচলিত বয়ানের সমালোচনা মানেই ইতিহাসের সমালোচনা নয় বরং ইতিহাসকে দখলের রাজনীতির সমালোচনা।
গ্রন্থটির একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রস্তাব হলো—ঐতিহাসিক ‘ছেদ’ ও ‘ধারাবাহিকতা’ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং গভীরভাবে সম্পর্কিত। পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান- এই তিনটি ঘটনাই বৈপ্লবিক ছেদ সৃষ্টি করলেও, এগুলোকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। আধিপত্যশীল জাতীয়তাবাদী বয়ান যেভাবে এসব ঘটনাকে পরস্পরের এন্টিথিসিস হিসেবে হাজির করে, এই গ্রন্থ তার বিপরীতে জনগণের সক্রিয়তা, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতার দিকটি তুলে ধরে।
গ্রন্থের আরেকটি কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হলো সহিংসতা। রাষ্ট্রীয় ও কাঠামোগত সহিংসতা কীভাবে রাজনৈতিক বয়ান, স্মৃতি ও পরিচয় নির্মাণে কাজ করে এবং কীভাবে কিছু মৃত্যুকে শোকযোগ্য আর কিছু মৃত্যুকে অদৃশ্য করে তোলে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এই আলোচনাকে তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপট দিয়েছে। গ্রন্থটি যুক্তি দেয়, খণ্ডিত শোক ও নির্বাচিত ভিকটিমহুড সহিংসতার চক্র ভাঙে না; বরং সকল সহিংসতার মানবিক স্বীকৃতি এবং ট্রানজিশনাল জাস্টিসের দিকেই ন্যায়বিচারের পথ নিহিত।
দুই পর্বে বিন্যস্ত এই গ্রন্থের প্রথম ভাগে রয়েছে পাকিস্তান আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রবন্ধ, আর দ্বিতীয় ভাগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী লেখা। সামগ্রিকভাবে, এটি ইতিহাস, বয়ান ও সহিংসতার সম্পর্ক নতুন করে ভাবার একটি সমালোচনামূলক প্রয়াস।