"মেসিয়াহ” আমার লেখা প্রথম উপন্যাস। কিন্তু এটি উপন্যাস হলেও আমার বহুদিনের পড়াশোনা ও চিন্তার ফসল। বিভিন্ন ধর্ম ও তার প্রভাব নিয়ে আমি দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে লিখি বাংলা ও ইংরেজি ছাড়াও আরও তিনটি ভাষায়। ফলে নানান চিন্তা স্বাভাবিকভাবে আমার মাথায় খেলে। আর ধর্ম তো শুধু উপাসনা ও ভক্তির বিষয় নয়। তার সাথে সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্নভাবে রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতি। ফলে সময়ের পরিক্রমায় চলে আসে ধর্মের নবায়ন বা আংশিক নবায়নের বিষয়টি। কিন্তু সেটি কে করবেন?
সব ধর্মেই ভবিষ্যতে এক মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর সম্পর্কে নানান ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে। কিন্তু যেভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যদ্বাণীগুলো করা হয়েছে, সেভাবে কি আদতেই আধুনিক যুগের চাহিদা মিটিয়ে কেউ আসবেন বা এসেছেন? প্রত্যেক যুগেই বিভিন্ন ধর্মবেত্তা তাদের সীমাবদ্ধতা সাথে নিয়েই এইসব ভবিষ্যদ্বাণীগুলো করেছেন। কিন্তু সময় এমনভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় যে, অনেক ভবিষ্যদ্বাণী পরে অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়ে। ফলে অনেকে নিজ ধর্মেই আস্থা হারিয়ে ফেলেন।
এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জিসান নামের এক তরুণ। যে ধর্ম, দর্শন ও অর্থনীতির এক সিরিয়াস পাঠক। সে সহজেই অন্যকে প্রভাবিত করতে পারে তার জ্ঞান ও পা-িত্য দিয়ে। তার আরেকটি গুণ, সে দ্রুত বিদেশি ভাষা শিখতে পারে। তবে সে তার সেই ক্ষমতা জ্ঞান শুধু ভাষা শেখাতেই সীমাবদ্ধ রাখে না। তা দিয়ে সে ব্যাপক জ্ঞানচর্চা ও তথ্যানুসন্ধানে ব্যাপৃত হয়। আর এই বিদেশি ভাষা শিখতে যেয়ে তার ঘনিষ্ঠতা হয় মাতিল্ডা আলবারেস নামের এক স্পেনিশ যুবতীর সাথে। যার সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে একসময় গড়ে উঠে জিসানের নিবিড় সখ্য ও পরে প্রেমের সম্পর্ক।
তবে জ্ঞানালোচনার বিষয়ে জিসানের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি যিনি, তিনি নানান মতাদর্শের উপর এক সিরিয়াস আলোচক। তিনি জাফর হাসান নামের এক প্রৌঢ়, যাঁর রয়েছে নানান বিষয়ে অগাধ পা-িত্য ও সবকিছুকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মনোভাব ও বিশ্লেষণী শক্তি। তিনি জিসানের প্রধান গুণগ্রাহী ও সুহৃদও বটে।
এই উপন্যাসটি দুই পর্বের। দুই পর্বই এই এক মলাটেই আছে।
প্রথম পর্বে উপন্যাসের স্বাভাবিক গতিতেই আসে পবিত্র কুরআনে আল্লাহর যে ধারণা আছে তার সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব, দেশের প্রধান ইসলামি রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১ সম্পর্কিত একটি পর্যালোচনা, জিসান যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত সিলোর দর্শনের উপর আলোকপাত, বৌদ্ধ ধর্মের বোধিসত্ত্ব ও অবলোকিতেশ্বরের উপর আলোচনা, বৌদ্ধদেবী তারা, জৈন অনেকান্তবাদ, প্লেটোর দর্শনসহ বহু বিষয়। এগুলো উপন্যাসের ধারাবাহিকতায় প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে এসেছে।
যারা মাহদীবাদ, শিয়া ইসলাম ও ইমামিয়া দর্শন, শিয়া অতীন্দ্রিয়বাদ, ইহুদি জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি কিংবা ক্যাথলিক মতবাদের সিরিয়াস পাঠক তারা এখানে সংক্ষেপে হলেও চিন্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খোরাক পাবেন। হিন্দু ধর্মের নানা প্রসঙ্গ এখানে এসেছে-এসেছে সপ্তম শতাব্দীর আচার্য শঙ্কর ও তাঁর তত্ত্বের পর্যালোচনা। আলোচনাতে ঠাঁই পেয়েছে ফেডেরিকো গার্সিয়া লোরকা ও সমকামিতা, আর সেই সূত্রে বর্গিয়াস পোপদের বিষয়াদিও। বাংলাদেশে খ্রিষ্ট ধর্মের ইতিহাসও অল্পের মধ্যে ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে এই উপন্যাসে। কিন্তু এই সবই করা হয়েছে উপন্যাসের রস ও কাঠামো বজায় রেখেই। যেহেতু এটি একটি উপন্যাস, তাই সবকিছুর সুদীর্ঘ আলোচনা এখানে করা যায়নি। কিন্তু বিষয়গুলোর মূল নির্যাস এখানে ভালোমতোই আছে। এখানে এমন কিছু আলোচনা এসেছে ও এমন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে কিংবা চিন্তার জগতে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে, বিশেষত ধর্মীয় পরিম-লের, যেগুলো হয়ত চিন্তার জগতে একেবারেই নতুন।
এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট যে সময়কে কেন্দ্র করে, তখন লাতিন আমেরিকাতে দার্শনিক মারিয়ো রডরিগেজ কবোস বা সিলোর আন্দোলন তুঙ্গে, যার জোয়ার এসে পড়েছে বাংলাদেশেও। আমাদের জিসানও তখন নিজেকে সিলোইস্ট হিসেবেই ভাবছে। এটি সেই অন্তর্দ্বন্দ্বের কাল, যখন একজন বুদ্ধিমান মুসলমান তাঁর ধর্মকে উপেক্ষা করতে পারছেন না, কিন্তু ঔপনিবেশিক ও পশ্চিমা শক্তির সামনে প্রচলিত ইসলাম ও তার বিধিবদ্ধ জ্ঞানকাঠামো নিয়ে মুসলমানরা যে দাঁড়াতে পারছেন না, সেই বিষয়েও সে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। ফলে ইসলামের নানান ধারা, অপরাপর ধর্ম, মার্ক্সবাদ, অস্তিত্ববাদ, জায়নবাদ, গ্রেকো-রোমান দর্শন সবই সে উল্টেপাল্টে দেখছে। পশ্চিমকে কোনোভাবে আত্মস্থ করা যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও সে খতিয়ে দেখছে। জিসান এই দলেরই একজন। এই উপন্যাসে আপনি জিসানের সেই অভিযাত্রারই অংশীদার।
উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বটি বেশ ছোটো। এই পর্বের পটভূমি সেই সময়, যখন টুইন টাওয়ারে ও পেন্টাগনে আঘাত হেনেছে আল-কায়েদা(?), ফলে আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন ও ন্যাটোর সামরিক হামলার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু পশ্চিমা আগ্রাসন থেকে ইসলামের কোনো ধারাই সেই অর্থে মুসলমান জাতিকে রক্ষা করতে পারছে না। প্রতিশ্রুত মাহদী ও মসীহ খোঁজার এক নিরন্তর সুরিয়াল (ংঁৎৎবধষ) প্রচেষ্টাও তাই চলছে আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানজগতে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, অতীতে তাঁর দাবিদারও হয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু সমগ্র মুসলমান জাতিকে সামগ্রিকভাবে কি তাঁরা ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন, পেরেছেন মুসলমানদের জ্ঞানজগতের ও বৈশ্বিক ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছে দিতে? বরং তাঁরা আরও কতকগুলো বিভক্তির জন্ম দিয়েছেন। তাঁরা কুরআন-হাদিস ঘেঁটে তিনিই যে মাহদী কিংবা মসীহ, তা প্রমাণ করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু সেই অসাধ্যটি সাধন করতে পারলে যে কুরআন-হাদিস প্রদর্শনেরও দরকার নেই, লোকে স্বগুণেই তাঁকে মেনে নেবেন, সেই বোধবুদ্ধি তাঁদের অনেকের হয়তো কখনোই ছিল না। যে কারণেই কি ইহুদিরা ঈসাকে তাঁদের মসীহ হিসেবে মেনে নেননি? এর উত্তর আমি দিয়েছি “যিশুর মসীহত্ব এবং বিতর্ক” নামক প্রবন্ধে। এই শিরোনামে আমার একটি পূর্ণাঙ্গ বইও শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। আর এখানেই আরেকটি বিষয় স্মর্তব্য, আমি প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে কোনো লেখা লিখি না। যদিও প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের উপরও আমার শ্রদ্ধা আছে। আমার এই উপন্যাসে বোধহয় এক যৌক্তিক মসীহ বা মাহদীকে খোঁজার প্রবল আকুতিও আছে।
আরেকটি কথা বলে রাখা ভালো। এই বইতে এমন অনেক বিষয়ের সূত্রপাত হয়েছে, যেসব ব্যাপারে কেউ কেউ আমাকে নানান তথ্য দিতে পারবেন, যেগুলো হয়তো আমারও জানা নেই। তারা আমাকে তথ্যগুলো দিলে আমি পরবর্তী লেখার ক্ষেত্রে উপকৃত হব। তবে সেই সাথে এ-ও বলে রাখা ভালো, জিসানের সব বক্তব্য আমার বক্তব্য নয়। আমি বিষয়গুলো উত্থাপন করেছি, যেগুলোর উত্তর আপনাদের কাছ থেকে পাবার পর পরবর্তী কোন বই লিখতে সেগুলো আমার জন্য সহায়ক হবে। এই বইয়ের কোনো মতামতই চূড়ান্ত মতামত নয়। এইসব আলোচনার অনেক কিছুই বহুদিন ধরে সমাজে চলে আসছে, বিশেষত বাংলাদেশের এবং বাইরের দুনিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিম-লে। আমি পাঠককে নতুন করে গুছিয়ে চিন্তা করতে উসকে দিয়েছি মাত্র। অনেক আলোচনার ধরন আমি উপস্থাপন করেছি আমার অভিজ্ঞতা থেকে, যেভাবে সেগুলো আমি আমার ছাত্রজীবনে শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে টিএসসিতে, মধুর ক্যান্টিনে, হলগুলোতে, কিংবা কোনো বন্ধুর বাসায়। চরিত্রগুলোর নাম পরিবর্তন করে আমি সেভাবেই সেগুলো হাজির করেছি। ফলে কেউ আশাকরি আহত বোধ করবেন না। আমি শুধু বাস্তব প্রেক্ষিতটা বোঝানোর জন্য সেগুলো এখানে হাজির করেছি মাত্র। তাই এখানকার যেকোনো বক্তব্যের যৌক্তিক বিরোধিতাও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য।
সাধারণ পাঠকরা বইটি পড়ে যেন আনন্দ পান, সেই চিন্তা মাথায় রেখে বইটি লেখা হয়েছে। ভাষাতে ও উপস্থাপনে অনাবশ্যক জটিলতা এড়ানো হয়েছে। আর সর্বশেষে এটি একটি রোমান্টিক উপন্যাসও বটে। সেই রসও এখানে শেষ পর্যন্ত অক্ষুণœ আছে। ধর্ম, দর্শন ও রাজনীতির সিরিয়াস পাঠকরা যে এই বইটি পড়ে মজা পাবেন, সে বিষয়ে আমার পুরোপুরি আস্থা আছে। উপন্যাসের শেষে যেসব বই থেকে ও প্রয়োজনীয় সূত্র থেকে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে, সেই গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্রের একটি তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে উপন্যাসের ভেতরেও বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর সংযুক্ত করা হয়েছে সিরিয়াস পাঠকদের কথা বিবেচনা করে। এই বইয়ের প্রেক্ষাপটের সময়কাল ১৯৯৮-২০১০।
সবশেষে এটিকে একটি উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করাই বাঞ্ছনীয়। সবাইকে আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও নিরন্তর শুভেচ্ছা।
মুহাম্মদ তানিম নওশাদ
১৯ এপ্রিল ২০২৪
শাহজাহান রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।