এক সন্ধ্যায় আমি পড়ছিলাম এলিফ শাফাকের The Forty Rules of Love—যা কেবল একটি উপন্যাস নয়; বরং হৃদয়ের গোপন দরজা খুলে দেওয়ার এক চাবিকাঠি। প্রতিটি অধ্যায়ে শামস তাবরেজি যেভাবে রুমি কিংবা অন্যদের হৃদয় বদলে দেন, ঠিক সেভাবেই তাঁর মুখে উচ্চারিত চল্লিশটি সূত্র আমার চিন্তা-চেতনায় গভীর আলোড়ন তোলে। এই সূত্রগুলো যেন একেকটি বাতিঘর—আত্মার গভীর সমুদ্রে পথ দেখায়।
কিন্তু বইটি শেষ করার পর আমার মনে হলো, এই রত্নসম সূত্রগুলো চরিত্রদের কথোপকথনের ভেতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কোনোটি চোখে পড়ে, কোনোটি চোখ এড়িয়ে যায়। কোনোটি স্পষ্ট, কোনোটি রূপকের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। প্রতিটি সূত্রই অমূল্য, অথচ সবগুলোকে একত্রে ধারণ করা কিংবা মনে রাখা সহজ নয়।
তখনই মনে হলো—এই চল্লিশটি সূত্রকে আলাদা করে, আবার একত্রে, হৃদয়ের ভাষায়, গল্পের আলোয়, ভালোবাসার ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করা দরকার। যেন পাঠক কেবল সূত্রগুলো পড়েই না, সেগুলো বুঝতেও পারেন, অনুভব করতে পারেন, এবং নিজের জীবনে প্রয়োগও করতে পারেন।
এই বইয়ে প্রথমে প্রতিটি রুল বা সূত্র ইংরেজিতে উপস্থাপন করা হয়েছে—মূলগ্রন্থের প্রতি সম্মান জানিয়ে। এরপর প্রতিটির একটি সংক্ষিপ্ত সারমর্ম ইংরেজিতে দেওয়া হয়েছে, যাতে মূল ভাবটি সহজে ধরা যায়। তারপর রয়েছে বাংলায় অনুবাদ—প্রথমে সম্পূর্ণ সূত্র, এরপর তার সংক্ষিপ্ত বাংলা রূপ।
তবে এখানেই থেমে থাকিনি। প্রতিটি সূত্র গভীরভাবে বোঝার জন্য দুটি করে গল্প রচনা করেছি। প্রথমটি একটি সুফিবাদী চেতনানির্ভর আখ্যান—যেখানে কোনো দরবেশ, সাধক, পথিক কিংবা হৃদয়বান মানুষের জীবনের আলোকে সূত্রটির ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। দ্বিতীয়টি একটি আধুনিক, সমসাময়িক গল্প—যা পাঠককে আজকের জীবনে সেই সূত্র বা রুল কীভাবে প্রাসঙ্গিক, তা উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে।
এর পাশাপাশি প্রতিটি সূত্রের গল্পের শেষে সংযোজন করেছি একটি ‘কোরআনের পাঠ’, যেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে—কীভাবে এই সূত্রগুলো কোরআনের বাণীর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, কীভাবে কোরআনের আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
এই বই লিখতে গিয়ে আমার নিজের মধ্যেও এক ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। লেখার সময় বারবার অনুভব করেছি—আমি নিজেই বদলে যাচ্ছি। প্রতিটি গল্প, প্রতিটি ব্যাখ্যা যেন আমাকে নিজেরই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে। যেমন রুমি শামসের সংস্পর্শে এসে নিজেকে নতুন করে চিনেছিলেন, তেমনি আমিও চেষ্টা করেছি সেই চিন্তার আলো আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে।
এই বইটি ভালোবাসার চল্লিশটি সূত্রের নিছক কোনো অনুবাদ নয়; এটি আমার হৃদয়ের একটি জার্নাল। এই চল্লিশটি সূত্র যেন আশিটি বন্ধ দরজা খোলার চাবি—যে কেউ, যে কোনো বয়সে, যে কোনো প্রশ্ন নিয়ে এই দরজাগুলোর সামনে দাঁড়াতে পারেন। প্রতিটি দরজা পেরোলেই ভেতরে আছে একটি গল্প—কখনো আলো, কখনো নীরব কান্না, কখনো আশার দীপ্তি।
আমি আশা করি, এই বই আপনাকে শুধু রুমি বা শামস তাবরেজিকে চিনতে সাহায্য করবে না; বরং নিজেকেও নতুন করে খুঁজে পেতে সহায়তা করবে। সূত্রগুলোর ব্যাখ্যায় বহু ক্ষেত্রে রুমির বরাত ব্যবহার করা হলেও, এগুলো কেবল শামস কিংবা রুমির ব্যক্তিগত সূত্র নয়—বরং সামগ্রিক সুফিবাদী চেতনারই প্রতিফলন।
এলিফ শাফাকের The Forty Rules of Love যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের জন্য এই বই হবে একটি অর্থবহ ব্যাখ্যামূলক অনুষঙ্গ। আর যাঁরা উপন্যাসটি না পড়েও শামস তাবরেজি, রুমি এবং সুফিবাদী ভালোবাসার দর্শন সম্পর্কে জানতে চান, তাঁদের জন্য এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন পাঠযাত্রা।
আপনার পাঠ আনন্দময় হোক।
প্রফেসর ড. আনিসুর রহমান ফারুক
ইউনিভার্সিটি অব ভাসা, ফিনল্যান্ড