অমৃত লাভের জন্য সাগর মন্থন ছিল পৌরাণিক সাহিত্যের বিস্ময়কর ঘটনা। মন্থনকর্মের আয়োজন করেছিল দেবতা ও অসুরেরা। প্রকান্ড সেই মন্থনে উঠে এসেছিল অমৃতের কলস। অমৃত প্রাপ্তির আগে উঠেছিল রত্নসম্ভার ও বিষ। এমন কি লাস্যময়ী অপ্সরাও উঠেছিল সেই মন্থনে। সে অন্য জগতের ব্যাপার। আমাদের পৃথিবী মরলোক। এখানে অমৃত নামক বিশেষ বস্তুর অস্তিত্ব নাই। মাটির পৃথিবীতে সবকিছু মরণশীল। তবে অমৃত কথাটা যেহেতু মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়েছে, এর উৎসের সন্ধান অব্যাহত আছে মানুষের ভাষা ও সাহিত্যে। ভাষা ও সাহিত্যের পরিমণ্ডলে প্রাজ্ঞজনেরা অমৃত হিসেবে নির্দেশ করেছেন মানুষের মূল্যবান কথাগুলিকে। তারা এর নাম দিয়েছেন কথামৃত। কথার অমৃত লাভে শ্রুতি ও পাঠ অপরিহার্য। পাঠ পরবর্তী কথার বিস্তার আধুনিক সমালোচনা সাহিত্যের জমিন। এক অর্থে একে পৌরাণিক মন্থনের আধুনিক রূপ বলা যেতে পারে। মানুষের কথামৃতকে ফলরূপে কল্পনা করা যাক। এই ফল ধরে মানুষের ভাবনা-বৃক্ষে। ভাষার ব্যাকরণ অনুসারে ‘মানুষ’ জাতিবাচক বিশেষ্য। জাতিবাচক হিসেবে ‘মানুষ’ এক। তবে সব গাছ যেমন একরকম গাছ নয়, সব মানুষের ভাবনাও একরকম নয়। অনুরূপভাবে বিভিন্ন ফলের স্বাদও বিভিন্ন। আলাদা না হলে বিশেষত্ব হয় না। কাজেই কথারূপ অমৃতফলের ভাবনা-বৃক্ষটিও বিশিষ্ট হবে।
এ রকম বিশিষ্ট এক ভাবনা-বৃক্ষের নাম অক্তাবিও পাস। মেক্সিকান কবি। বিশ্বজুড়ে বহু ভাষার পাঠকের দরবারে সম্মানিত। কবি নিজেই যখন কবিতার সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হন তার আলাদা গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। পাস এই বইয়ে কবিতার সমালোচনার ভেতর দিয়ে বেশকিছু মৌলিক চিন্তার উদ্রেক করেছেন। আলাপের আলো ফেলেছেন রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, পুরাণ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব ও মরমী ভাবনার এলাকায়।
সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন শাখা কবিতা। কবিতা কবির একান্ত ভাবনার প্রকাশ। কবিতা একই সাথে কবির সমাজ, ভাষা ও বিশ্বাস থেকে উৎসারিত একটি বিষয়। যেহেতু কবিতা সামাজিক বিষয় সেহেতু কবিতায় ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি, নন্দনতত্ত্ব অথবা মরমী ভাবনার প্রকাশ ঘটে। অথচ খোদ কবিতা ধর্ম, দর্শন বা অন্য কিছুতে পর্যবসিত হয় না। কবিতা রাজনীতি, ইতিহাস বা নন্দনতত্ত্ব নয়। কবিতা আয়নার মতো। প্রত্যেকে তার নিজস্ব প্রতিফলন দেখার সুযোগ পায় কবিতায়।
এই বইটি মূলত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দি চার্লস এলিয়ট নর্টন লেকচার্স’-এ প্রদত্ত বক্তৃতার সংকলন। অক্তাবিও পাস তাঁর বক্তৃতায় গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। পাসের কাব্য সমালোচনার পদ্ধতিতে রাজনীতি, সংস্কৃতি বা ইতিহাস এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপার নাই। পাস তাঁর বক্তৃতায় স্প্যানিশ-আমেরিকান কাব্যচর্চার বৈচিত্রময় ইতিহাসে আলো ফেলেছেন। কবিতার নিরিখে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের স্বরূপ বিশ্লেষণ এই বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিভিন্ন সভ্যতায় সময় সম্পর্কে মানুষের ধারণা নিয়ে তিনি মৌলিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। সময় সম্পর্কে প্রাচ্যের ঐতিহ্যগত ধারণা চক্রাকার। পাশ্চাত্যের ধারণা রৈখিক। এই পরিবর্তন ঘটেছে খ্রিষ্টীয় পণ্ডিত সন্ত পলের যুক্তিতর্কের পরে। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সময় সম্পর্কে পাশ্চাত্যের পরিবর্তিত ধারণার প্রভাব রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে মানুষের মাঝে যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দ্বারা একুশ শতাব্দী বিশিষ্ট। ভাষা ও সংস্কৃতিতে এই যোগাযোগের প্রভাব বিচিত্র। সাহিত্যচর্চায়ও এর ছাপ অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে অনুবাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। অক্তাবিও পাস বিষয়টি নিয়ে একটি অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। বাংলাভাষী পাঠকেরা ইতিমধ্যে পাস-এর কবিতার সঙ্গে পরিচিত। তাঁর চিন্তার অন্যান্য দিকগুলো বাংলা ভাষায় সুলভ করতে এই অনুবাদ প্রচেষ্টা। আলাপের বিস্তার রোম্যান্টিসিজম থেকে আভা গার্দ পর্যন্ত হলেও আমাদের সমকালে এই আলাপ নানাদিক থেকে প্রাসঙ্গিক। আমাদের ভাবনা জগতের বোঝাপড়ায় অক্তাবিও পাসের ভাবনা পাঠকদের কাজে লাগবে বলে মনে করি। স্প্যানিশ নামগুলোর বাংলা প্রতিবর্ণীকরণে অনুবাদক রাজু আলাউদ্দীন আমাকে সাহায্য করেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
গৌরাঙ্গ হালদার
মিরপুর, ঢাকা
জানুয়ারি ২০২৫















