আমরা যেই জীবন উদযাপন করছি তার নেপথ্যে রয়েছে অগুনতি মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস। যাদের জীবন আর ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা আর মুক্তির স্বাদ পেয়েছি তাদের ক্ষরণ অনুসন্ধান করতে গেলে মুহুর্মুহু রক্তাক্ত হতে হয়। রক্তাক্ত হতে হতে জেনেছি আমাদের দেশের মাটিতে অযুত-নিযুত আগুনভাঙা ফুল কী করে ফুটেছে। আগুন দগ্ধ করে, ধ্বংস করে, আগুন ভেঙে ভেঙে ফুলও ফোটে। উনিশশো একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন নিপীড়িত, নির্যাতিত নারী আর যুদ্ধশিশুরাই তো আমাদের এই আগুনভাঙা ফুল।
একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বাংলাদেশের অসংখ্য নারীকে পাশবিকভাবে নিপীড়ন ও যৌন নির্যাতন করেছে। আমরা জানি যুগে যুগে পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে তাতে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়েছেন এবং বর্ণনাতীত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধারণা করা হয় একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর কর্তৃক বাংলাদেশের নারীদের ওপর যেই নির্যাতন ও নিপীড়ন করা হয়েছে তা পৃথিবীর বহু যুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের নৃশংসতা, বর্বরতাকে ছাড়িয়ে গেছে।
ডা. এম এ হাসান রচিত একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত নারী নির্যাতন ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের সংকট বিষয়ক প্রামাণ্য দলিল যুদ্ধ ও নারী গ্রন্থে উল্লেখ আছে, সামগ্রিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, একাত্তরের নয় মাসে সাড়ে চার লাখেরও বেশি নারী পাকিস্তানিদের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে শতকরা ৫৬.৫০ ভাগ মুসলিম, ৪১.৪৪ ভাগ হিন্দু এবং ২.০৬ ভাগ খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের। এই নারীরা শুধু যুদ্ধের সময়েই পাশবিক নির্যাতনের শিকার হননি, যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও তারা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে নির্যাতনের জের টেনে বেড়িয়েছেন। তাদের কেউ কেউ আত্মগ্লানিতে ভুগে ভুগে নীরবে, নিভৃতে মৃত্যুকে আলিঙ্গনও করেছেন।
বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থ, সাক্ষাৎকার, পত্রপত্রিকা ও আর্কাইভ থেকে একাত্তরে নারীদের ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌনদাসী বানিয়ে রাখা, তাদের অঙ্গহানিকরাসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হত্যা ইত্যাদি যত ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায় তা কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে পাঠ করা সম্ভবনা। তবু প্রতিনিয়ত আমাদের সত্যের মুখোমুখি হতে হয়, অন্তরের তাগিদে জানতে হয়, নতুন প্রজন্মকে জানাতে হয় প্রকৃত ইতিহাস আর মানুষের আত্মত্যাগের গল্প। এই জানতে চাওয়া আর জানানোর প্রচেষ্টা হিসাবেই আগুনভাঙা ফুল গল্প সংকলনের জন্ম। এই সংকলনে ৩৮ নারীর কলমে রচিত ৩৮ টি গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আগুনভাঙা ফুল-এর গল্পক্রমে গল্পকারদের নাম বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়েছে। গল্পকারদের মধ্যে এদেশের প্রথিতযশা গল্পকার যেমন রয়েছেন তেমনি রয়েছেন একেবারে নবীন গল্পকার। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো বীরাঙ্গনা মা ও যুদ্ধশিশুকে নিয়ে গল্প লিখেছেন যা এই সংকলনের অন্যতম প্রাপ্তি হয়ে থাকবে। বীরাঙ্গনা মায়ের কথা লিখতে গেলে অনিবার্যভাবে যুদ্ধশিশুর প্রসঙ্গ চলে আসে। তাই আগুনভাঙা ফুল’ সংকলনের বিভিন্ন গল্পে প্রাসঙ্গিকভাবে যুদ্ধশিশুর প্রসঙ্গ এসেছে। বিশ্বাস করি, নিবিড়ভাবে পাঠ করলে পাঠক উপলব্ধি করবেন, গল্পগুলো আমাদের বাংলাদেশের একেকটি আগুনভাঙা ফুলের দীপ্তির বিচ্ছুরণ। আগুনভাঙা ফুল’ প্রকাশের ক্ষেত্রে যাদের আন্তরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি তাদের কথা না বললেই না বইটির নামকরণ করে ঋণী করেছেন প্রচ্ছদশিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।
পান্ডুলিপি তৈরিতে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করে আরও ঋণী করেছেন সুহৃদ তানিয়া আক্তার ও সংকলনের প্রাজ্ঞ গল্পকারবৃন্দ পরিশেষে আগুনভাঙা ফুল প্রকাশ করার জন্য ‘গ্রন্থিক প্রকাশন’-এর কর্ণধার রাজ্জাক রুবেল এবং তার সহকর্মীদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।