‘আগুনের স্বপ্ন ফাগুনের ফুল’ পরিবর্তনশীল পৃথিবীর শোষিত-বঞ্চিত মানুষের লড়াইয়ের সমর্থনে কবি ভজন বিশ্বাসের প্রথম কাব্যপ্রয়াস। এই কাব্যে স্পষ্ট যে, কবি দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতেই সমাজকে দেখতে চান। তিনি মানুষের স্বপ্নের শ্বেতকপোতের আগমনের অধীর প্রতীক্ষাকে যেমন অবলোকন করেন; তেমনি একটি স্বপ্নের মৃত্যু কীভাবে হয়, তা-ও প্রকাশ করেন মানবমনের একান্ত অনুভূতির সাহায্যে।
সমাজ-রাষ্ট্রে মূলত দুটি পক্ষ রয়েছে—মালিক ও শ্রমিক। কবির সচেতন অবস্থান নিপীড়িত শ্রমজীবী মানুষের প্রতি। কাব্যের পরতে পরতে ব্যঞ্জিত হয় সেই প্রত্যয় ধ্বনি, ঘোষিত হয় শোষকদের প্রতি তীব্র ধিক্কার।
সমষ্টির মাঝেও রয়েছে ব্যক্তিক অবস্থানের ভিন্নতা; রয়েছে ব্যক্তিমনের অনুভূতির বৈচিত্র্যময় প্রকাশ। তবু চূড়ান্ত বিচারে তা সমাজের সমষ্টির সঙ্গেই সম্পর্কিত। তাই কবি আস্থা রাখেন সমষ্টির শক্তির ওপর। বিপ্লবের আগুন বুকে নিয়ে স্বপ্ন লালন করেন ফাগুনের ফুল ফোটানোর। আর সেটা একমাত্র শোষণমুক্ত উন্নত সমাজ গঠনের মাধ্যমেই সম্ভব। সেই পথেও রয়েছে উত্থান-পতন, এক পা বাড়ানো দু’পা পেছানোর গল্প। পথিকমনে তাই অবিরত প্রশ্নের জন্ম দিয়ে যান কবি। উত্তর অন্বেষণে হয়তো কেউ সমর্থ হন, কেউ-বা হন না। অথচ প্রশ্নহীন মানুষ কখনো সমাজের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারেন না। অন্ধতার চশমা পরা মানুষের দিকে আঙুল উঁচিয়ে তিনি আওয়াজ তোলেন সত্য উন্মোচনে। সংকোচ করেন না প্রশ্নহীনের দিকে প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিতেও।
কবি ভজন বিশ্বাস দ্রোহী ও প্রেমিক মনের অধিকারী। ফলে দ্রোহের পাশাপাশি প্রেমের পদাবলিও ঝরেছে তাঁর কাব্যে। এসেছে ফুলের ঝরে যাওয়ার দুঃখ, কোনো এক পাখির সংগ্রাম, মৃত্যুর মহড়া, প্রিয় হারাবার ক্রন্দন, বিরহ-বেদনা, পিতার সংগ্রামী স্মৃতি, বুলেটবিদ্ধ প্রেমসরণির কথাও।
কবি সময়কে ধারণ করেছেন তাঁর কাব্যে। অতীতের সংগ্রামী স্মৃতিকে আগলে রেখে নিকট সংগ্রামের কথাও তিনি বাদ দেননি। স্বভাবতই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময়কে তিনি ছুঁয়েছেন কবিতায়।
ছোটবেলা থেকেই লেখালেখিতে হাতেখড়ি তাঁর। মোট ৫০টি কবিতার সমন্বয়ে এটাই তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। পাঠক এখানে বিষয়বস্তু, উপাদানের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি খুঁজে পাবেন কাব্যের প্রকরণ-শৈলি ও প্রকাশভঙ্গিমার অভিনবত্ব।